হাদিস কুদসি কী?

প্রকাশিত: লিখেছেন Farhat Khan
✅ Expert-Approved Content
Rate this

হাদিস কুদসি হলো এমন হাদিস, যার অর্থ ও মূল বক্তব্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এসেছে, কিন্তু তা নবী মুহাম্মদ (ﷺ) নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এটি কুরআনের অংশ নয় এবং সাধারণ হাদিসেরও ঊর্ধ্বে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর হাদিস কুদসিতে অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে হলেও শব্দ নবীজির।


বিস্তারিত ব্যাখ্যা

হাদিস কুদসি (الحديث القدسي) শব্দের অর্থ ‘পবিত্র হাদিস’ বা ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণিত হাদিস’। ইসলামী পরিভাষায় হাদিস কুদসি বলতে সেইসব হাদিসকে বোঝায়, যেখানে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বর্ণনা করেছেন, তবে তা কুরআনের মতো ওহি মাতলু (তিলাওয়াতযোগ্য ওহি) নয়।

সাধারণত হাদিস কুদসির বর্ণনায় এ ধরনের শব্দ পাওয়া যায়:

  • “আল্লাহ তাআলা বলেন…”
  • “আমার রব বলেছেন…”
  • “রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর রব থেকে বর্ণনা করেন…”

হাদিস কুদসি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, বান্দার প্রতি ভালোবাসা, তাওবা, ইবাদত ও আখিরাত সম্পর্কিত বহু মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে।

হাদিস কুদসির প্রধান বৈশিষ্ট্য

  • অর্থ ও মূল বক্তব্য আল্লাহর পক্ষ থেকে।
  • শব্দ ও বাক্যবিন্যাস নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর।
  • এটি কুরআনের অংশ নয়।
  • তিলাওয়াত ইবাদত নয়, তবে পাঠ করা সওয়াবের কাজ।
  • সহিহ, হাসান বা জঈফ—সব ধরনের সনদে হাদিস কুদসি পাওয়া যেতে পারে।

হাদিস কুদসির গুরুত্ব

হাদিস কুদসি আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ককে গভীরভাবে তুলে ধরে। অনেক হাদিস কুদসিতে আল্লাহর অসীম দয়া, ক্ষমা ও বান্দার প্রতি অনুগ্রহের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই আকিদা, আখলাক ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।


হাদিস কুদসির উদাহরণ

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

“আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী আচরণ করি। যখন সে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সঙ্গে থাকি।’”

— সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

আরেকটি হাদিস কুদসিতে এসেছে:

“হে আদম সন্তান! তুমি অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নাওনি। যদি তার খোঁজ নিতে, তবে সেখানে আমাকে পেতে।”

— সহিহ মুসলিম

এই হাদিসগুলোতে আল্লাহর বাণী নবী (ﷺ)-এর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছে।


কুরআন ও হাদিস কুদসির মধ্যে পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যকুরআনহাদিস কুদসি
বাণীর উৎসআল্লাহর শব্দ ও অর্থআল্লাহর অর্থ, নবীর শব্দ
মর্যাদাসর্বোচ্চকুরআনের নিচে
তিলাওয়াত ইবাদতহ্যাঁনা
নামাজে পাঠআবশ্যকবৈধ নয়
সংরক্ষণআল্লাহর বিশেষ হেফাজতেহাদিসশাস্ত্রের মাধ্যমে সংরক্ষিত
চ্যালেঞ্জ (ই’জায)আছেনেই
সংখ্যা১১৪ সূরানির্দিষ্ট সংখ্যা নেই

গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

কুরআনের প্রতিটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। কিন্তু হাদিস কুদসিতে আল্লাহর বক্তব্য নবী (ﷺ) নিজের ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তাই কুরআনের মর্যাদা হাদিস কুদসির চেয়ে অনেক বেশি।


কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“তিনি নিজের প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। এটি তো ওহি, যা তাঁর প্রতি প্রেরণ করা হয়।”

— সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩-৪

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নবী (ﷺ)-এর কাছে কুরআনের পাশাপাশি অন্যান্য ওহিও এসেছে। হাদিস কুদসি সেই ওহির একটি বিশেষ রূপ হিসেবে বিবেচিত।

আরও বলেন:

“আর রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।”

— সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭


হাদিসের দলিল

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

“আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দারা! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের মাঝেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’”

— সহিহ মুসলিম

এটি একটি বিখ্যাত হাদিস কুদসি, যা আল্লাহর ন্যায়বিচার ও দয়ার শিক্ষা দেয়।


হাদিস কুদসি কীভাবে চিহ্নিত করা যায়?

মুহাদ্দিসগণ সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট বাক্যের মাধ্যমে হাদিস কুদসি চিহ্নিত করেন, যেমন:

  • “قال الله تعالى” (আল্লাহ তাআলা বলেন)
  • “يقول الله عز وجل” (আল্লাহ বলেন)
  • “عن ربه” (তিনি তাঁর রব থেকে বর্ণনা করেন)

তবে মনে রাখতে হবে, শুধু “আল্লাহ বলেন” থাকলেই তা কুরআন হয়ে যায় না। কুরআন ও হাদিস কুদসির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।


আলেমদের মতামত

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)

তিনি বলেন:

“হাদিস কুদসি কুরআনের মর্যাদায় পৌঁছায় না, তবে সাধারণ হাদিসের তুলনায় এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।”

ইমাম নববী (রহ.)

তিনি বলেন:

“হাদিস কুদসিতে আল্লাহর বক্তব্য রয়েছে, তাই এগুলো অধ্যয়ন ও শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ইমাম ইবনু হাজার আসকালানি (রহ.)

তিনি উল্লেখ করেন যে, হাদিস কুদসি ওহির একটি বিশেষ রূপ, যা কুরআনের বাইরে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল (ﷺ)-এর কাছে এসেছে।


সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ধারণা ১: হাদিস কুদসি কুরআনেরই অংশ

সঠিক উত্তর: না। হাদিস কুদসি কুরআনের অংশ নয়। কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু হাদিস কুদসির শব্দ নবী (ﷺ)-এর।

ভুল ধারণা ২: সব হাদিস কুদসি সহিহ

সঠিক উত্তর: না। হাদিস কুদসি সহিহ, হাসান বা জঈফ—যেকোনো মানের হতে পারে। তাই প্রতিটি হাদিস কুদসির সনদ আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়।

ভুল ধারণা ৩: হাদিস কুদসি তিলাওয়াত করলে কুরআনের সমান সওয়াব পাওয়া যায়

সঠিক উত্তর: না। কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। হাদিস কুদসি পাঠের সওয়াব আছে, কিন্তু তা কুরআনের সমপর্যায়ের নয়।

ভুল ধারণা ৪: নামাজে হাদিস কুদসি পড়া যায়

সঠিক উত্তর: ফরজ বা নফল নামাজে কুরআনের আয়াত পড়তে হয়; হাদিস কুদসি দিয়ে কিরাত আদায় হয় না।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

হাদিস কুদসি ও কুরআনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর হাদিস কুদসির অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে হলেও শব্দ নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর।

কতটি হাদিস কুদসি আছে?

নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। বিভিন্ন সংকলনে প্রায় ১০০-এর বেশি হাদিস কুদসি পাওয়া যায়।

হাদিস কুদসি কীভাবে চিহ্নিত করা যায়?

যেসব হাদিসে নবী (ﷺ) আল্লাহর পক্ষ থেকে বক্তব্য বর্ণনা করেন—যেমন “আল্লাহ তাআলা বলেন”—সেগুলো সাধারণত হাদিস কুদসি।

হাদিস কুদসি কি ওহি?

হ্যাঁ, অধিকাংশ আলেমের মতে হাদিস কুদসির অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে এসেছে, তবে এটি কুরআনের মতো ওহি মাতলু নয়।

নামাজে হাদিস কুদসি পড়া যায় কি?

না। নামাজে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতে হয়; হাদিস কুদসি দিয়ে কিরাত আদায় হয় না।

উপসংহার

হাদিস কুদসি ইসলামী জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে আল্লাহ তাআলার বক্তব্য নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এটি কুরআনের অংশ নয়, তবে সাধারণ হাদিসের তুলনায় বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, বান্দার প্রতি ভালোবাসা এবং আত্মশুদ্ধির বহু শিক্ষা হাদিস কুদসিতে সংরক্ষিত রয়েছে। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত সহিহ হাদিস কুদসি অধ্যয়ন করে সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

Avatar of Farhat Khan

Farhat Khan

ফারহাত খান একজন একনিষ্ঠ ইসলামিক লেখক এবং গবেষক। তিনি মূলত উলুমুল কুরআন (তাফসীর), হাদিস শাস্ত্র এবং শুদ্ধ আকীদা নিয়ে কাজ করেন। ইসলামের মূল বাণী ও সঠিক তথ্যসূত্র পাঠকদের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

আমার সব আর্টিকেল

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন