সুনান ইবনে মাজাহ কুতুবুস সিত্তাহতে কেন অন্তর্ভুক্ত?

প্রকাশিত: লিখেছেন Farhat Khan
✅ Expert-Approved Content

সুনান ইবনে মাজাহ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থ। এটি কুতুবুস সিত্তাহ বা ছয়টি প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থের ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে সুপরিচিত। গ্রন্থটির সংকলক ছিলেন ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মাজাহ আল-কাজভিনি (২০৯–২৭৩ হিজরি)। হাদিসশাস্ত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কুতুবুস সিত্তাহর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রাচীন মুহাদ্দিসদের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও অধিকাংশ আলেম সুনান ইবনে মাজাহকে ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর অন্যতম কারণ হলো এতে এমন বহু হাদিস রয়েছে, যা অন্য পাঁচটি প্রধান হাদিসগ্রন্থে পাওয়া যায় না। পাশাপাশি এর ফিকহি গুরুত্ব, অধ্যায় বিন্যাস এবং গবেষণামূলক মূল্য একে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

সুনান ইবনে মাজাহ কুতুবুস সিত্তাহতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কারণ এতে প্রায় ১৩৩৯টি অনন্য হাদিস রয়েছে, যা অন্য পাঁচটি প্রধান হাদিসগ্রন্থে নেই। ফিকহি মাসায়িল, ইবাদত, লেনদেন ও সামাজিক বিধান সম্পর্কিত বহু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস এতে সংকলিত হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ এর বৈজ্ঞানিক বিন্যাস ও গবেষণামূলক গুরুত্বের কারণে একে কুতুবুস সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

ইমাম ইবনে মাজাহ ও তাঁর গ্রন্থের পরিচয়

ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. ছিলেন তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস। তিনি ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে হাদিস সংগ্রহ করেন এবং দীর্ঘ গবেষণার পর ‘সুনান ইবনে মাজাহ’ সংকলন করেন।

গ্রন্থটিতে আকিদাহ, ইবাদত, ফিকহ, নৈতিকতা, সামাজিক বিধান ও ইসলামী জীবনব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কারণেই এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মূল্যবান জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত।

১. অনন্য হাদিসের উপস্থিতি

সুনান ইবনে মাজাহর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে এমন বহু হাদিস রয়েছে, যা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ, জামে তিরমিজি ও সুনান নাসাঈতে নেই।

গবেষকদের মতে, এতে প্রায় ১৩৩৯টি অতিরিক্ত বা অনন্য হাদিস রয়েছে। এই হাদিসগুলো ইসলামী আইন ও জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।

২. ফিকহি গুরুত্ব

সুনান ইবনে মাজাহ ফিকহি মাসায়িলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এতে আলোচনা করা হয়েছে—

  • পবিত্রতা (তাহারাত)
  • সালাত
  • সিয়াম
  • যাকাত
  • হজ
  • বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
  • ব্যবসা-বাণিজ্য
  • বিচারব্যবস্থা
  • সামাজিক বিধান

ফকিহগণ বিভিন্ন মাসআলা নির্ধারণে এই গ্রন্থের হাদিস থেকে উপকৃত হয়েছেন।

৩. সুশৃঙ্খল অধ্যায় বিন্যাস

গ্রন্থটি প্রায় ৩৭টি প্রধান অধ্যায়ে বিন্যস্ত।

এর বৈশিষ্ট্য হলো—

  • বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় বিভাজন
  • সহজ অনুসন্ধানযোগ্য কাঠামো
  • ফিকহি ধারাবাহিকতা
  • শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য সুবিধাজনক উপস্থাপন

এই বিন্যাস গ্রন্থটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

৪. মুহাদ্দিসদের স্বীকৃতি

প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ দীর্ঘদিন ধরে সুনান ইবনে মাজাহকে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বিশেষভাবে—

  • ইমাম যাহাবি
  • ইমাম সুয়ুতি
  • ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি
  • অন্যান্য হাদিস বিশেষজ্ঞ

তাঁরা গ্রন্থটির উপকারিতা ও গবেষণামূলক মূল্য স্বীকার করেছেন।

৫. হাদিসের সংখ্যা

সুনান ইবনে মাজাহতে পুনরাবৃত্তিসহ প্রায় ৪৩৪১টি হাদিস রয়েছে।

এই বিপুল হাদিসভাণ্ডার ইসলামের বিভিন্ন বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং বহু ফিকহি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

৬. ইমাম ইবনে মাজাহর সংকলন পদ্ধতি

ইমাম ইবনে মাজাহ কেবল সহিহ হাদিস সংকলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি।

তিনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন—

  • সহিহ হাদিস
  • হাসান হাদিস
  • কিছু জঈফ হাদিস

তবে পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ এসব হাদিসের মান যাচাই করেছেন এবং কোনটি শক্তিশালী, কোনটি দুর্বল—তা স্পষ্ট করেছেন।

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।”

— সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩

এই আয়াত মুসলমানদের নির্ভরযোগ্য জ্ঞানসূত্র অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়। ইমাম ইবনে মাজাহ বিভিন্ন আলেম ও মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদিস সংগ্রহ করে এই নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ করেছেন।

আরও ইরশাদ হয়েছে:

“রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।”

— সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্যই হাদিস সংকলন করা হয়েছে।

হাদিসের দলিল

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“আল্লাহ সেই ব্যক্তির মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করুন, যে আমার কথা শুনে তা সংরক্ষণ করে এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়।”

— সুনান আবু দাউদ, জামে তিরমিজি

এই হাদিস হাদিস সংরক্ষণ ও প্রচারের গুরুত্ব তুলে ধরে। ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন এই মহান কাজের জন্য।

আরও জানা যায় যে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু সাহাবীকে হাদিস লিখে রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে হাদিস সংরক্ষণের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আলেমদের মতামত

ইমাম যাহাবি

তিনি উল্লেখ করেছেন যে সুনান ইবনে মাজাহ একটি অত্যন্ত উপকারী গ্রন্থ, যা বহু ফিকহি বিষয়ে সহায়ক।

ইমাম সুয়ুতি

তিনি সুনান ইবনে মাজাহকে কুতুবুস সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এর মর্যাদা স্বীকার করেছেন।

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি

তিনি বলেন, যদিও গ্রন্থটিতে কিছু দুর্বল হাদিস রয়েছে, তবুও এর ফিকহি গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

ড. মুহাম্মদ ফুয়াদ আবদুল বাকি

তিনি আধুনিক যুগে গ্রন্থটির সম্পাদনা ও সূচিপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে এর গবেষণামূলক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করেছেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ধারণা ১: সুনান ইবনে মাজাহতে অনেক দুর্বল হাদিস আছে, তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়

বাস্তবে এতে বহু সহিহ ও হাসান হাদিস রয়েছে। পাশাপাশি এমন অনেক অনন্য হাদিস আছে, যা অন্য পাঁচ গ্রন্থে পাওয়া যায় না।

ভুল ধারণা ২: এটি কৃত্রিমভাবে কুতুবুস সিত্তাহতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে

এ ধারণা ভুল। মুহাদ্দিসগণ দীর্ঘ গবেষণা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে এর ফিকহি গুরুত্ব বিবেচনা করে একে কুতুবুস সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ভুল ধারণা ৩: এটি শুধুমাত্র দুর্বল হাদিসের সংগ্রহ

এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। গ্রন্থটিতে সহিহ, হাসান ও জঈফ—তিন ধরনের হাদিসই রয়েছে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

ইমাম ইবনে মাজাহ কে?

ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. ছিলেন তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এবং সুনান ইবনে মাজাহ গ্রন্থের সংকলক।

সুনান ইবনে মাজাহতে কতটি হাদিস আছে?

পুনরাবৃত্তিসহ এতে প্রায় ৪৩৪১টি হাদিস রয়েছে।

সুনান ইবনে মাজাহ কি সহিহ হাদিসের গ্রন্থ?

এতে সহিহ, হাসান এবং কিছু জঈফ হাদিস রয়েছে। তাই এটি কেবল সহিহ হাদিসের গ্রন্থ নয়।

কুতুবুস সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে ইবনে মাজাহ কেন নির্বাচিত?

এর অনন্য হাদিসসমূহ, ফিকহি গুরুত্ব, সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং আলেমদের স্বীকৃতির কারণে এটি কুতুবুস সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

উপসংহার

সুনান ইবনে মাজাহ কুতুবুস সিত্তাহর ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে ইসলামী জ্ঞানচর্চায় একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এতে কিছু দুর্বল হাদিস থাকলেও প্রায় ১৩৩৯টি অনন্য হাদিস, বিস্তৃত ফিকহি আলোচনা এবং গবেষণামূলক মূল্য একে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। হাদিস গবেষক, আলেম, ফকিহ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অপরিহার্য গ্রন্থ, যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

1 বছর সদস্য
ফারহাত খান একজন একনিষ্ঠ ইসলামিক লেখক এবং গবেষক। তিনি মূলত উলুমুল কুরআন (তাফসীর), হাদিস শাস্ত্র এবং শুদ্ধ আকীদা নিয়ে কাজ করেন। ইসলামের মূল বাণী ও সঠিক তথ্যসূত্র পাঠকদের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরাই তাঁর মূল...

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন