মারফু, মওকুফ, মাকতু হাদিস কী?

প্রকাশিত: লিখেছেন Farhat Khan
✅ Expert-Approved Content

মারফু (Marfu‘), মওকুফ (Mawquf) এবং মাকতু (Maqtu‘) হলো হাদিসশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা, যা কোনো বর্ণনার উৎস বা তা কার বক্তব্য—তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। যে বর্ণনা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধিত হয় তাকে মারফু, সাহাবির বক্তব্য বা কর্মকে মওকুফ এবং তাবিঈর বক্তব্য বা কর্মকে মাকতু বলা হয়। হাদিসের প্রকৃতি ও মর্যাদা বোঝার জন্য এই তিনটি পরিভাষা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

মারফু হাদিস হলো যে বর্ণনা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ, অনুমোদন বা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। মওকুফ হাদিস হলো সাহাবির বক্তব্য, কাজ বা মতামত। আর মাকতু হাদিস হলো তাবিঈদের বক্তব্য বা কর্ম। এই তিনটির প্রধান পার্থক্য হলো বর্ণনার উৎস ব্যক্তি।

মারফু হাদিস: সংজ্ঞা ও উদাহরণ

মারফু হাদিস কী?

মারফু (مرفوع) শব্দের অর্থ “উন্নীত” বা “উপরে তোলা”। হাদিসশাস্ত্রে এমন বর্ণনাকে মারফু বলা হয়, যা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধিত করা হয়।

এটি হতে পারে—

  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য।
  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো কাজ।
  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমোদন।
  • রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলির বর্ণনা।

মারফু হাদিসের উদাহরণ

হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।”

এই বর্ণনা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য হওয়ায় এটি একটি মারফু হাদিস

মওকুফ হাদিস: সংজ্ঞা ও উদাহরণ

মওকুফ হাদিস কী?

মওকুফ (موقوف) শব্দের অর্থ “থামানো”। যে বর্ণনা কোনো সাহাবির বক্তব্য, কাজ বা ব্যক্তিগত মতামতের ওপর গিয়ে থেমে যায় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছায় না, তাকে মওকুফ বলা হয়।

এ ধরনের বর্ণনা সাহাবিদের জ্ঞান, ফিকহ ও ব্যাখ্যা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সরাসরি নববী বাণী নয়।

মওকুফ হাদিসের উদাহরণ

যদি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কোনো বিষয়ে নিজস্ব মতামত বা ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধিত না হয়, তাহলে সেই বর্ণনা মওকুফ হিসেবে গণ্য হবে।

মাকতু হাদিস: সংজ্ঞা ও উদাহরণ

মাকতু হাদিস কী?

মাকতু (مقطوع) শব্দের অর্থ “বিচ্ছিন্ন” বা “কেটে যাওয়া”। হাদিসশাস্ত্রে যে বর্ণনা কোনো তাবিঈর বক্তব্য, কর্ম বা মতামতের ওপর গিয়ে শেষ হয়, তাকে মাকতু বলা হয়।

তাবিঈ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সাহাবিদের সাক্ষাৎ পেয়েছেন কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেননি।

মাকতু হাদিসের উদাহরণ

যদি প্রসিদ্ধ তাবিঈ হাসান আল-বাসরি (রহ.) কোনো ধর্মীয় উপদেশ বা ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং তা তাঁর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়, তাহলে সেটি মাকতু বর্ণনা হবে।

তিন প্রকারের মধ্যে মূল পার্থক্য

বিষয়মারফুমওকুফমাকতু
বর্ণনার উৎসরাসুলুল্লাহ (সা.)সাহাবিতাবিঈ
কার কাছে গিয়ে শেষ হয়নবী (সা.)সাহাবিতাবিঈ
মর্যাদাসর্বোচ্চসাহাবির বক্তব্যতাবিঈর বক্তব্য
উদাহরণ“রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন…”“ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন…”“হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন…”
হাদিসশাস্ত্রে গুরুত্বঅত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণগুরুত্বপূর্ণগুরুত্বপূর্ণ

সহজভাবে মনে রাখার উপায়:

  • মারফু → নবী (সা.) পর্যন্ত পৌঁছে।
  • মওকুফ → সাহাবির কাছে থামে।
  • মাকতু → তাবিঈর কাছে থামে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

মারফু হাদিস কি সবসময় সহিহ হয়?

না। মারফু হওয়া মানেই সহিহ হওয়া নয়। একটি মারফু হাদিস সহিহ, হাসান বা জয়িফ—যেকোনো ধরনের হতে পারে। এর বিশুদ্ধতা সনদ ও বর্ণনাকারীদের ওপর নির্ভর করে।

মওকুফ হাদিস কি হাদিস হিসেবে গণ্য হয়?

হ্যাঁ। হাদিসশাস্ত্রের পরিভাষায় এটি একটি বর্ণনার ধরন। তবে এটি সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য নয়; বরং সাহাবির বক্তব্য বা কর্ম।

মাকতু হাদিস কি তাবিঈদের বক্তব্য?

হ্যাঁ। কোনো তাবিঈর বক্তব্য, কাজ বা মতামতকে মাকতু বলা হয়।

মারফু, মওকুফ ও মাকতুর মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদার কোনটি?

মারফু বর্ণনার মর্যাদা সর্বোচ্চ, কারণ এটি সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

একজন মুহাদ্দিস কেন এই শ্রেণিবিভাগ ব্যবহার করেন?

হাদিসের উৎস, মর্যাদা ও প্রমাণমূল্য নির্ধারণের জন্য মুহাদ্দিসগণ এই শ্রেণিবিভাগ ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোনো বক্তব্য নবী (সা.), সাহাবি নাকি তাবিঈর।

উপসংহার

মারফু, মওকুফ এবং মাকতু হাদিসশাস্ত্রের মৌলিক ও অপরিহার্য পরিভাষা। মারফু বর্ণনা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে সম্পৃক্ত, মওকুফ সাহাবিদের (রা.) বক্তব্য বা কর্মকে নির্দেশ করে এবং মাকতু তাবিঈদের (রহ.) বাণী বা আমলকে বোঝায়। হাদিসশাস্ত্রের ছাত্র বা সাধারণ পাঠক হিসেবে এই তিনটি শ্রেণি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই শ্রেণিবিন্যাস বুঝতে পারলে হাদিসের উৎস, মর্যাদা এবং তার প্রমাণমূল্য (Evidential Value) নির্ণয় করা সহজতর হয়, যা ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে আরও সুসংহত ও নির্ভুল করে তোলে।

1 বছর সদস্য
ফারহাত খান একজন একনিষ্ঠ ইসলামিক লেখক এবং গবেষক। তিনি মূলত উলুমুল কুরআন (তাফসীর), হাদিস শাস্ত্র এবং শুদ্ধ আকীদা নিয়ে কাজ করেন। ইসলামের মূল বাণী ও সঠিক তথ্যসূত্র পাঠকদের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরাই তাঁর মূল...

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন