হাদিস সংকলনের ইতিহাস ইসলামের জ্ঞানভাণ্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। “প্রথম হাদিস সংকলক কে?”—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে সাহাবী ও তাবেঈ যুগের ইতিহাস জানতে হয়। আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ সাহাবীদের লিখিত সহিফাকে প্রথম হাদিস সংকলন হিসেবে উল্লেখ করেন, আবার অনেক গবেষক ইমাম যুহরি (রহ.)-কে প্রথম সুশৃঙ্খল হাদিস সংকলক হিসেবে অভিহিত করেন। তাই প্রশ্নটির উত্তর নির্ভর করে ‘সংকলন’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তার ওপর।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রথম হাদিস সংকলক কে—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কিছু বর্ণনা অনুযায়ী আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, ইমাম যুহরি (রহ.) (মৃত্যু ১২৪ হিজরি) প্রথম ব্যক্তি যিনি হাদিসকে সুশৃঙ্খলভাবে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন। অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর ‘আস-সহিফাতুস সাদিকাহ’ প্রাচীনতম লিখিত হাদিস সংকলনের অন্যতম উদাহরণ।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
সাহাবীদের সংকলন (প্রথম পর্যায়)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকেই কিছু সাহাবী হাদিস লিখে সংরক্ষণ করতেন। যদিও কুরআনের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথম দিকে হাদিস লেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হতো, পরে প্রয়োজন অনুযায়ী লিখে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
আবু বকর (রা.)
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে তিনি কিছু হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ভুল সংরক্ষণের আশঙ্কায় সেগুলো পরে ধ্বংস করে দেন।
উমর (রা.)
তিনি হাদিস লিপিবদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু মুসলমানরা যেন কুরআনের পরিবর্তে অন্য কিছুর প্রতি বেশি মনোযোগী না হয়ে পড়ে, সে কারণে তিনি ব্যাপক সংকলন থেকে বিরত থাকেন।
আমর ইবনুল আস (রা.)
তিনি হাদিস লিখে সংরক্ষণ করতেন। তাঁর সংরক্ষিত নথিগুলো ইসলামের প্রাচীন লিখিত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)
তিনি ‘আস-সহিফাতুস সাদিকাহ’ নামে একটি বিখ্যাত সহিফা লিখেছিলেন। এতে প্রায় এক হাজার হাদিস সংরক্ষিত ছিল বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন। এটি হাদিসের প্রথমদিকের লিখিত সংকলনগুলোর অন্যতম।
তাবেঈদের সংকলন (দ্বিতীয় পর্যায়)
ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে হাদিস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। তখন তাবেঈগণ পরিকল্পিতভাবে হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ শুরু করেন।
ইমাম যুহরি (রহ.)
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শিহাব আয-যুহরি (রহ.)-কে অধিকাংশ গবেষক প্রথম সুশৃঙ্খল হাদিস সংকলক হিসেবে উল্লেখ করেন। উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) তাঁকে হাদিস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেন।
ইমাম যুহরি (রহ.):
- হাদিসকে বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজিয়েছিলেন।
- বর্ণনাগুলোকে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করেছিলেন।
- হাদিস সংকলনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি চালু করেছিলেন।
- পরবর্তী মুহাদ্দিসদের জন্য ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।
ইমাম যুহরির পূর্ববর্তী অন্যান্য ব্যক্তিত্ব
ইমাম যুহরি (রহ.)-এর আগে আবু বকর ইবনে হাজম, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবসহ আরও অনেক আলেম হাদিস লিখে সংরক্ষণ করেছিলেন। তবে তাঁদের কাজ ছিল সীমিত পরিসরে, যেখানে ইমাম যুহরি বৃহত্তর ও সুশৃঙ্খল সংকলন পরিচালনা করেন।
মূল বক্তব্য
“প্রথম হাদিস সংকলক” বলতে যদি প্রথম লিখিত হাদিস সংগ্রাহক বোঝানো হয়, তাহলে সাহাবীদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যদি প্রথম সুশৃঙ্খল ও গ্রন্থাকারে হাদিস সংকলক বোঝানো হয়, তাহলে ইমাম যুহরি (রহ.)-কেই অধিকাংশ আলেম প্রথম সংকলক হিসেবে বিবেচনা করেন।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা যদি না জানো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।”
— সূরা আন-নাহল, ১৬:৪৩
এই আয়াত জ্ঞান সংরক্ষণ ও জ্ঞানীদের থেকে তা গ্রহণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে। সাহাবী ও তাবেঈগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ সংরক্ষণের জন্য হাদিস লিখে ও সংকলন করে এই নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।
হাদিসের দলিল
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আমি তোমাদের মধ্যে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা তা আঁকড়ে ধরবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।”
— মুয়াত্তা মালিক
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে সুন্নাহ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিস সংকলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে নিরাপদ রাখা।
আরেক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু সাহাবীকে তাঁর বক্তব্য লিখে রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে হাদিস লিপিবদ্ধ করার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
আলেমদের মতামত
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)
তিনি ‘ফাতহুল বারি’-তে উল্লেখ করেন যে ইমাম যুহরি (রহ.) হাদিসকে সুশৃঙ্খলভাবে সংকলনের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
ইমাম যাহাবি (রহ.)
‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রন্থে তিনি সাহাবীদের লিখিত সহিফাগুলোর উল্লেখ করেছেন এবং হাদিস সংরক্ষণে তাঁদের অবদানের প্রশংসা করেছেন।
ড. মুস্তাফা আল-আজমি
তিনি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে হাদিস লেখার কাজ সাহাবীদের যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল এবং এটি পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত রূপ লাভ করে।
আল্লামা সিদ্দিক হাসান খান
তিনি হাদিস সংকলনের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম যুহরির অবদানকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
সাধারণ ভুল ধারণা
ভুল ধারণা ১: ইমাম বুখারিই প্রথম হাদিস সংকলক
এটি সঠিক নয়। ইমাম বুখারি (রহ.) তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর আলেম ছিলেন। তাঁর আগে বহু হাদিস সংকলন ও সহিফা রচিত হয়েছিল।
ভুল ধারণা ২: সাহাবীরা হাদিস লিখতেন না
এ ধারণাও ভুল। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), আলী (রা.) এবং আরও অনেক সাহাবী হাদিস লিখে সংরক্ষণ করেছিলেন।
ভুল ধারণা ৩: ইমাম যুহরিই প্রথম ও একমাত্র সংকলক
আসলে তিনি প্রথম সুশৃঙ্খল সংকলক হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর আগেও সাহাবী ও তাবেঈদের লিখিত সংকলন ছিল।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
সাহাবীদের মধ্যে কে প্রথম হাদিস লিখেছিলেন?
নির্দিষ্টভাবে প্রথম ব্যক্তি নির্ধারণ করা কঠিন। তবে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর ‘আস-সহিফাতুস সাদিকাহ’ সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাচীন লিখিত হাদিস সংকলনগুলোর একটি।
ইমাম যুহরির সংকলন পদ্ধতি কী ছিল?
তিনি হাদিসগুলো সংগ্রহ করে বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজিয়েছিলেন এবং লিখিত গ্রন্থ আকারে সংরক্ষণ করেছিলেন।
‘আস-সহিফাতুস সাদিকাহ’ কী?
এটি আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর সংকলিত একটি বিখ্যাত হাদিস-সহিফা, যাতে প্রায় এক হাজার হাদিস ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
কেন ইমাম যুহরিকে প্রথম সংকলক বলা হয়?
কারণ তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হাদিসকে অধ্যায় ও বিষয়ভিত্তিকভাবে সুশৃঙ্খল গ্রন্থাকারে সংকলন করেছিলেন।
উপসংহার
প্রথম হাদিস সংকলক কে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে ‘সংকলন’ শব্দটির অর্থের ওপর। সাহাবীগণ প্রথম লিখিত সহিফা তৈরি করেছিলেন এবং সুন্নাহ সংরক্ষণের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। অন্যদিকে ইমাম যুহরি (রহ.) হাদিসকে সুশৃঙ্খলভাবে গ্রন্থাকারে সংকলন করে হাদিস সংরক্ষণের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেন। তাই লিখিত সংকলনের ক্ষেত্রে সাহাবীদের অবদান এবং সুশৃঙ্খল গ্রন্থ সংকলনের ক্ষেত্রে ইমাম যুহরির অবদান—উভয়ই সমানভাবে স্মরণীয়।
Your comment will appear immediately after submission.