পবিত্র কুরআনের দীর্ঘতম সূরা হলো সূরা আল-বাকারাহ (সূরা নং ২)। এই সূরায় মোট ২৮৬টি আয়াত এবং এটি প্রায় ২৫ পারা (জুজ) জুড়ে বিস্তৃত। মদিনায় অবতীর্ণ এই সূরায় ঈমান, ইসলামী আইন, মুসলিম সমাজের নির্দেশনা ও কিসসাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হয়েছে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
সূরা আল-বাকারাহ সম্পর্কে বিস্তারিত:
- (১) আয়াত সংখ্যা: ২৮৬ (বিভিন্ন কেরাতে সামান্য ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে সর্বাধিক স্বীকৃত সংখ্যা ২৮৬)
- (২) অবতরণকাল: মাদানী (হিজরতের পর প্রথম দিকে নাযিল হয়)
- (৩) সূরার মূল বিষয়বস্তু: ঈমান ও তাওহিদ, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ, জিহাদ, বিবাহ ও তালাক, সুদ (রিবা), অঙ্গীকার, বনী ইসরাঈলের ইতিহাস, ইব্রাহিম (আ.) ও কাবার নির্মাণ, কিসসা, মানবাধিকার ইত্যাদি।
- (৪) সূরায় বিখ্যাত আয়াতসমূহ: আয়াতুল কুরসি (২:২৫৫), ঋণের লেখার নির্দেশ (২:২৮২), “লা ইকরাহা ফিদ্দীন” (ধর্মে জবরদস্তি নেই – ২:২৫৬), ইত্যাদি।
- (৫) এই সূরার ফজিলত: হাদিসে বর্ণিত – “সূরা বাকারাহ পাঠ করো, কারণ তা গ্রহণ করা বরকত ও তা পরিত্যাগ করা ক্ষতি” (মুসলিম)। শয়তান যে ঘর থেকে এই সূরা পাঠ করা হয় সেখানে প্রবেশ করে না (বুখারি, মুসলিম)।
কুরআনের দলিল
প্রাসঙ্গিক কুরআনের আয়াত হিসেবে সূরা আল-বাকারাহর গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলোর কয়েকটি হলো:
- আয়াতুল কুরসি (২:২৫৫): আল্লাহর একত্ব ও সার্বভৌমত্বের বর্ণনা।
- কিসসা-ই-আদম ও ইবলিস (২:৩০-৩৯): সৃষ্টির সূচনা ও ইবলিসের অহংকারের ঘটনা।
- ইব্রাহিম (আ.)-এর পরীক্ষা (২:১২৪): “আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিমকে তাঁর রব কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন…”
- কিবলা পরিবর্তনের আয়াত (২:১৪৪), ঋণের দলিলের নির্দেশ (২:২৮২) ইত্যাদি।
হাদিসের দলিল
- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “প্রত্যেক বস্তুর জন্য একটি শীর্ষ রয়েছে, আর কুরআনের শীর্ষ হলো সূরা আল-বাকারাহ।” (তিরমিজি)
- “তোমরা সূরা আল-বাকারাহ তিলাওয়াত করো, কেননা তা গ্রহণ করা বরকত এবং তা ত্যাগ করা পরিতাপের কারণ।” (মুসলিম)
- “যে ঘরে সূরা আল-বাকারাহ তিলাওয়াত করা হয়, শয়তান সে ঘরে প্রবেশ করে না।” (বুখারি ও মুসলিম)
- সাহাবায়ে কেরাম সূরা বাকারাহ শেখা ও শেখানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন; এমনকি উমর (রা.) সাহাবিদের এটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন।
আলেমদের মতামত
প্রখ্যাত মুফাসসিরগণের মতে:
- ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, সূরা আল-বাকারাহ কুরআনের মূলনীতিগুলোর সারসংকলন।
- ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর মতে এ সূরায় ঈমান, ইবাদত ও মুআমালাতের পূর্ণাঙ্গ বিধান বিদ্যমান।
- সাইয়েদ কুতুব (রহ.) এ সূরাকে ঈমানি বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ পটভূমি হিসেবে দেখেছেন।
- মাওলানা মাওদুদি (রহ.)-এর মতে এটি ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।
সকল তাফসিরবিদ একমত যে, সূরা বাকারাহর তাফসির বুঝলে কুরআনের মূল ভাবনা বোঝা সহজ হয়।
সাধারণ ভুল ধারণা
- “সূরা বাকারাহ শুধু আইন-কানুনের সূরা”: এটি ভুল ধারণা। সূরাটিতে ঈমান, ইতিহাস, উপদেশ, কিয়ামত ও ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির মতো বিষয়ও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
- “খুব দীর্ঘ, তাই পড়া কঠিন”: অনেকে ভাবেন সূরা বাকারাহ খুব বড় বলে পড়া অসম্ভব। কিন্তু ভেঙে ভেঙে, অল্প অল্প করে নিয়মিত তিলাওয়াত করাই বরকত ও নিরাপত্তার মাধ্যম, যা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
সম্পর্কিত প্রশ্ন
কুরআনের সংক্ষিপ্ততম সূরা কোনটি?
কুরআনের সংক্ষিপ্ততম সূরা হলো সূরা আল-কাওসার (সূরা নং ১০৮)। এতে মাত্র ৩টি আয়াত রয়েছে।
কুরআনের প্রথম ও শেষ সূরা কোনটি?
প্রথম সূরা সূরা আল-ফাতিহা (সূরা নং ১), শেষ সূরা সূরা আন-নাস (সূরা নং ১১৪)।
পবিত্র কুরআনে মোট কতটি সূরা আছে?
কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা আছে। এর মধ্যে ৮৬টি মাক্কী ও ২৮টি মাদানী সূরা হিসেবে প্রসিদ্ধ।
আয়াতুল কুরসি কোন সূরার অংশ?
আয়াতুল কুরসি হলো সূরা আল-বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। এটি কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আয়াত।
সূরা বাকারাহর শেষ দুই আয়াতের নাম কী?
“আমানার রাসুলু…” (২:২৮৫-২৮৬) নামে পরিচিত এই দুই আয়াতের রয়েছে বিশেষ ফজিলত। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রাতে এই দুই আয়াত তিলাওয়াত করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।
উপসংহার
সূরা আল-বাকারাহ কুরআনের দীর্ঘতম সূরা এবং ইসলামি জীবনবিধানের মৌলিক ভিত্তি। এতে বিশ্বাস, ইবাদত, লেনদেন, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় ঘটেছে। এর তিলাওয়াত ঘরে বরকত আনে এবং শয়তানকে দূরে রাখে। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও ভেঙে ভেঙে এ সূরার চর্চা অব্যাহত রাখা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
Your comment will appear immediately after submission.