ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্সসহ প্রায় সব ইউরোপীয় দেশ সেই আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্চ ২০২৬-এ ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে এই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কী ঘটেছে?
ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জোটে যোগ দিতে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ মোতায়েন করতে বলেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাই এই অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন সপ্তাহ পর ইউরোপীয় নেতারা দ্বিধা ছেড়ে সরাসরি জানিয়ে দিলেন — তারা এই অভিযানে অংশ নেবেন না।
মূল তথ্য
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোরিস পিস্টোরিয়াস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এটা আমাদের যুদ্ধ নয়, আমরা এটা শুরু করিনি।” ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, এটা কোনো ন্যাটো মিশন নয় এবং কখনো হওয়ার কথাও ছিল না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁও একই সুরে জানান, “ফ্রান্স এই যুদ্ধ বেছে নেয়নি, আমরা এতে অংশগ্রহণ করছি না।”
বিভিন্ন পক্ষের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের “বোকামির মারাত্মক ভুল” করেছে বলে সমালোচনা করেন এবং স্টারমারকে “কোনো উইনস্টন চার্চিল নন” বলে কটাক্ষ করেন। ব্রিটেনের বিরোধীদলীয় নেত্রী কেমি বাডেনক পাল্টা বলেন, “হোয়াইট হাউস থেকে আসা কথার যুদ্ধ শিশুসুলভ।” স্পেনের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীও কড়া ভাষায় বলেন, “আমরা কারো অধীন হবো না, কোনো হুমকি সহ্য করবো না।”
পটভূমি
ইউরোপীয় নেতারা এমন একটি সংঘাতে জড়াতে চান না, যার উদ্দেশ্য তারা পুরোপুরি বোঝেন না এবং যা তাদের নিজ দেশের জনগণের কাছেও অজনপ্রিয়। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে তারা ইরানের আগাম হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু গোয়েন্দা তথ্য সেই দাবিকে সমর্থন করে না। এই অবিশ্বাসই ইউরোপকে ট্রাম্পের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
পরবর্তী পরিণতি কী?
ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছেন যে ইউরোপ সাহায্য না করলে তিনি ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই বিভেদের কারণে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থনও কমে যেতে পারে। সবমিলিয়ে ইরান সংকট আটলান্টিকের দুই পারের সম্পর্কে গভীর ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১: ইউরোপ কেন ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ায়নি?
ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করে এই যুদ্ধ তাদের স্বার্থ বা নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তাছাড়া যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে তাদের সাথে কোনো পরামর্শও করা হয়নি। তাই তারা এটিকে “আমেরিকার যুদ্ধ” হিসেবেই দেখছে।
২: এই বিভেদ কি ন্যাটো জোটকে দুর্বল করে দেবে?
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়েছেন, যা জোটের ঐক্যে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ঘটনা আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তবে জোট পুরোপুরি ভেঙে পড়বে কিনা, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
৩: হরমুজ প্রণালি নিয়ে এত উদ্বেগ কেন?
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ ভাগ তেল সরবরাহ হয়, যা বন্ধ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ সংকট দেখা দেবে। ইউরোপ ইতোমধ্যে জ্বালানির উচ্চমূল্যে জর্জরিত, তাই এই প্রণালি বন্ধ হলে তাদের অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত আসবে। এ কারণেই ইউরোপ কূটনৈতিক সমাধানকে সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
৪: এই সংকটে ইউক্রেনের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ট্রাম্প ইউরোপকে সাহায্য না করার শাস্তি হিসেবে ইউক্রেনে মার্কিন সহায়তা কমিয়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পরিস্থিতি ইউক্রেনের বিপক্ষে চলে যেতে পারে। ফলে ইউরোপ এখন একসাথে দুটি সংকট মোকাবেলার চাপে পড়েছে।
৫: ইরান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান কি সম্ভব?
নেতারা সামরিক পথ এড়িয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছেন। তারা মনে করেন, সংলাপ ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব। তবে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এই শান্তি প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, সিএনএন, পিবিএস নিউজ, ফোর্চুন (মার্চ ১৬-১৯, ২০২৬)
Your comment will appear immediately after submission.