কুরআন তিলাওয়াতের সময় কিছু নির্দিষ্ট আয়াতে পৌঁছালে সিজদায়ে তিলাওয়াত করার বিধান রয়েছে। মুসহাফে এসব স্থান সাধারণত বিশেষ সিজদার চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে। তাই কুরআন পড়ার সময় সিজদার স্থানগুলো জানা থাকলে তিলাওয়াত করা আরও সহজ হয়।
প্রচলিত গণনা অনুযায়ী কুরআনে ১৫টি সিজদার স্থান রয়েছে। তবে ফিকহি মতপার্থক্যের কারণে কিছু আলেম ও মাযহাবে ১৪টি সিজদার স্থান গণনা করা হয়। এই পার্থক্য কুরআনের মূল পাঠের মধ্যে কোনো ভিন্নতার কারণে নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু আয়াতকে সিজদায়ে তিলাওয়াতের স্থান হিসেবে গণনা করা হবে কি না, সে বিষয়ে ফিকহি মতপার্থক্যের কারণে।
কুরআনে সিজদার স্থান কতটি?
প্রচলিত ১৫টি সিজদার স্থান ধারাবাহিকভাবে নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রম | সূরা | আয়াত | পারা |
|---|---|---|---|
| ১ | আল-আ’রাফ | ৭:২০৬ | ৯ |
| ২ | আর-রাদ | ১৩:১৫ | ১৩ |
| ৩ | আন-নাহল | ১৬:৫০ | ১৪ |
| ৪ | আল-ইসরা | ১৭:১০৯ | ১৫ |
| ৫ | মারইয়াম | ১৯:৫৮ | ১৬ |
| ৬ | আল-হজ | ২২:১৮ | ১৭ |
| ৭ | আল-হজ | ২২:৭৭ | ১৭ |
| ৮ | আল-ফুরকান | ২৫:৬০ | ১৯ |
| ৯ | আন-নামল | ২৭:২৬ | ১৯ |
| ১০ | আস-সাজদাহ | ৩২:১৫ | ২১ |
| ১১ | সাদ | ৩৮:২৪ | ২৩ |
| ১২ | ফুসসিলাত | ৪১:৩৮ | ২৪ |
| ১৩ | আন-নাজম | ৫৩:৬২ | ২৭ |
| ১৪ | আল-ইনশিকাক | ৮৪:২১ | ৩০ |
| ১৫ | আল-আলাক | ৯৬:১৯ | ৩০ |
এই তালিকা অনুযায়ী সূরা আল-হজে দুটি সিজদার স্থান রয়েছে—২২:১৮ এবং ২২:৭৭। অন্য তালিকাভুক্ত সূরাগুলোতে একটি করে সিজদার স্থান রয়েছে।
কুরআনের ১৫টি সিজদা — Sajdah Journey
| label | value |
|---|---|
| ১ — আল-আ'রাফ | ৭:২০৬ | ৯ম পারা | ২০৬ |
| ২ — আর-রাদ | ১৩:১৫ | ১৩তম পারা | ১৫ |
| ৩ — আন-নাহল | ১৬:৫০ | ১৪তম পারা | ৫০ |
| ৪ — আল-ইসরা | ১৭:১০৯ | ১৫তম পারা | ১০৯ |
| ৫ — মারইয়াম | ১৯:৫৮ | ১৬তম পারা | ৫৮ |
| ৬ — আল-হজ | ২২:১৮ | ১৭তম পারা | ১৮ |
| ৭ — আল-হজ | ২২:৭৭ | ১৭তম পারা | ৭৭ |
| ৮ — আল-ফুরকান | ২৫:৬০ | ১৯তম পারা | ৬০ |
| ৯ — আন-নামল | ২৭:২৬ | ১৯তম পারা | ২৬ |
| ১০ — আস-সাজদাহ | ৩২:১৫ | ২১তম পারা | ১৫ |
| ১১ — সাদ | ৩৮:২৪ | ২৩তম পারা | ২৪ |
| ১২ — ফুসসিলাত | ৪১:৩৮ | ২৪তম পারা | ৩৮ |
| ১৩ — আন-নাজম | ৫৩:৬২ | ২৭তম পারা | ৬২ |
| ১৪ — আল-ইনশিকাক | ৮৪:২১ | ৩০তম পারা | ২১ |
| ১৫ — আল-আলাক | ৯৬:১৯ | ৩০তম পারা | ১৯ |
সিজদায়ে তিলাওয়াত কী?
সিজদায়ে তিলাওয়াত হলো কুরআনের নির্দিষ্ট সিজদার আয়াত তিলাওয়াত বা শ্রবণের সঙ্গে সম্পর্কিত সিজদা। এটি সাধারণ নামাজের দুই সিজদার মতো নয়; সাধারণভাবে এতে একটি সিজদা করা হয়।
সিজদায়ে তিলাওয়াতের হুকুম, ওযু থাকা, কিবলামুখী হওয়া এবং তিলাওয়াতকারী বা শ্রোতার ক্ষেত্রে এর বিধান নিয়ে মাযহাবভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই বাস্তবে আমল করার ক্ষেত্রে নিজের অনুসৃত মাযহাবের নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা অনুসরণ করা উত্তম।
১৪টি ও ১৫টি সিজদার পার্থক্য কেন?
কুরআনের সিজদার সংখ্যা নিয়ে ১৪ ও ১৫—দুই ধরনের গণনা পাওয়া যায়। এর মূল কারণ হলো ফিকহি মতপার্থক্য।
বিশেষভাবে দুটি স্থান এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ:
- সূরা আল-হজ, আয়াত ২২:৭৭
- সূরা সাদ, আয়াত ৩৮:২৪
কোনো ফিকহি গণনায় আল-হজ ২২:৭৭ সিজদার স্থান হিসেবে গণনা করা হয়, আবার অন্য গণনায় এটি বাদ দেওয়া হয়। একইভাবে সূরা সাদ ৩৮:২৪-এর ক্ষেত্রেও আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
অতএব, ১৪ বা ১৫—কোন সংখ্যা বলা হচ্ছে তা বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট ফিকহি মত বা মাযহাবের গণনাটি জানা প্রয়োজন।
সূরা সাদ ৩৮:২৪ কি সিজদার আয়াত?
হানাফি ফিকহের প্রচলিত গণনায় সূরা সাদ ৩৮:২৪ সিজদার স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে অন্যান্য ফিকহি মতামতে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
তাই কোনো মুসহাফ বা তালিকায় সূরা সাদের ৩৮:২৪-কে সিজদার চিহ্নসহ দেখা গেলে সেটি ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক; আবার অন্য কোনো তালিকায় ভিন্নতা থাকলেও তা সরাসরি কুরআনের পাঠের পার্থক্য বোঝায় না।
সূরা আল-হজ ২২:৭৭ নিয়ে মতভেদ কেন?
সূরা আল-হজের ৭৭ নম্বর আয়াতে মুমিনদের রুকু ও সিজদা করে আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কিছু আলেম এটিকে সিজদায়ে তিলাওয়াতের স্থান হিসেবে গণনা করেছেন।
অন্য কিছু ফিকহি মত এটিকে স্বতন্ত্র সিজদায়ে তিলাওয়াতের স্থান হিসেবে গণনা করে না। এ কারণেই ১৪ ও ১৫টি সিজদার তালিকায় পার্থক্য দেখা যায়।
৩০তম পারায় কয়টি সিজদার স্থান আছে?
প্রচলিত ১৫টি সিজদার তালিকা অনুযায়ী ৩০তম পারায় দুটি সিজদার স্থান রয়েছে:
- ১৪. সূরা আল-ইনশিকাক — ৮৪:২১
- ১৫. সূরা আল-আলাক — ৯৬:১৯
এর মধ্যে সূরা আল-আলাকের ১৯ নম্বর আয়াত প্রচলিত ১৫টি তালিকা অনুযায়ী কুরআনের সর্বশেষ সিজদার স্থান।
সিজদার আয়াত কীভাবে খুঁজে পাবেন?
মুদ্রিত কুরআন বা মুসহাফে সাধারণত সিজদার স্থান বিশেষ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত থাকে। অনেক ডিজিটাল কুরআন অ্যাপেও সিজদার আয়াত আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়।
তবে দ্রুত খুঁজে পাওয়ার জন্য সূরা ও আয়াত নম্বর জানা সবচেয়ে কার্যকর। বিশেষ করে ৩০তম পারার দুটি স্থান সহজে মনে রাখা যায়:
আল-ইনশিকাক ৮৪:২১ → আল-আলাক ৯৬:১৯
কুরআনের ১৫টি সিজদার স্থান এক নজরে
দ্রুত রেফারেন্সের জন্য ধারাবাহিকভাবে ১৫টি স্থান:
- ১. আল-আ’রাফ — ৭:২০৬
- ২. আর-রাদ — ১৩:১৫
- ৩. আন-নাহল — ১৬:৫০
- ৪. আল-ইসরা — ১৭:১০৯
- ৫. মারইয়াম — ১৯:৫৮
- ৬. আল-হজ — ২২:১৮
- ৭. আল-হজ — ২২:৭৭
- ৮. আল-ফুরকান — ২৫:৬০
- ৯. আন-নামল — ২৭:২৬
- ১০. আস-সাজদাহ — ৩২:১৫
- ১১. সাদ — ৩৮:২৪
- ১২. ফুসসিলাত — ৪১:৩৮
- ১৩. আন-নাজম — ৫৩:৬২
- ১৪. আল-ইনশিকাক — ৮৪:২১
- ১৫. আল-আলাক — ৯৬:১৯
উপসংহার
প্রচলিত গণনা অনুযায়ী কুরআনে ১৫টি সিজদার স্থান রয়েছে। এগুলো সূরা আল-আ’রাফ থেকে শুরু করে সূরা আল-আলাক পর্যন্ত বিভিন্ন সূরায় ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সূরা আল-হজে দুটি সিজদার স্থান এবং ৩০তম পারায় দুটি সিজদার স্থান রয়েছে।
তবে কিছু ফিকহি মত অনুযায়ী সিজদার স্থান ১৪টি গণনা করা হয়। বিশেষ করে সূরা আল-হজ ২২:৭৭ ও সূরা সাদ ৩৮:২৪-এর বিধান নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এই পার্থক্য দেখা যায়।
তাই কুরআনের সিজদার স্থান সম্পর্কে কোনো ভিন্ন তালিকা দেখলে সেটিকে সরাসরি ভুল না ধরে কোন ফিকহি মত বা মাযহাবের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি হয়েছে, তা দেখা উচিত। কুরআনের সিজদার স্থানগুলো জানা তিলাওয়াতকে সহজ করে এবং সিজদায়ে তিলাওয়াত সম্পর্কিত বিধান সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করে।
Your comment will appear immediately after submission.