উপহার

✅ Expert-Approved Content

রাজকুমার মাহাতো

গয়নার বাক্সটা খুব ধীরে ধীরে খুললেন চিন্ময়ীদেবী। একে একে বের করলেন গলার হার, কানের দুল, মাথার টায়রা-টিকলি আর নাকের নথ। সবশেষে বের করলেন একজোড়া হাতের বালা। চোখে জল এলো চিন্ময়ীদেবীর। গতকাল প্রভার বিয়ে। এইসব গয়না দিয়ে মুড়ে দেওয়া হবে তাকে। তবে এত গয়নার মধ্যেও জ্বলজ্বল করবে এই বালা জোড়া।

হঠাৎ কাঁধে কারোর হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমকে উঠলেন তিনি। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন কখন যেন সন্তর্পণে তাঁর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন রজতবাবু। তড়িঘড়ি চোখের জল মুছে কিছু বলার আগেই রজতবাবু বললেন, ভয় লাগছে? ছেড়ে দাও না। প্রভা না-হয় নাই জানলো, তাতে কি এসে যায়! এতগুলো বছর যখন ও তোমাকেই…

কথাটা শেষ করতে পারলেন না রজতবাবু। ওঁর কথার মাঝেই গয়নার বাক্সটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন চিন্ময়ীদেবী। একচোখ হতাশা নিয়ে তাকালেন রজতবাবুর দিকে। খুব শান্ত স্বরে বললেন, মেয়েটা সত্যিটা না জেনেই চলে যাবে? ওর জীবনের এতবড় একটা সত্যি লুকিয়ে আমি যদি মরে যাই, তবে মরেও শান্তি পাব না। আমাকে যে বলতেই হবে ওকে।

রজতবাবু বুকে টেনে নিলেন চিন্ময়ীদেবীকে। তারপর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, দেখো তুমি যেটা ভালো বোঝো। আগামীকাল ওর বিয়ে। তুমি আর একটু একান্তে ভেবে নাও। তারপর আজকেই আইবুড়ো ভাত খাওয়ানোর পরে না-হয় ওকে একা ডেকে সবটা জানিয়ে দিও!

রজতবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন চিন্ময়ীদেবী। বিছানার উপর বসে আবারও বালা-জোড়াটার দিকে তাকালেন তিনি। চোখ বন্ধ হয়ে এলো তাঁর।

হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল তাঁদের সেই ছোটবেলার গ্রাম। ছোট্ট চিন্ময়ী আর তার দিদি দেবকী দৌড়ে বেড়াচ্ছে ধানক্ষেতের আল ধরে। দিদির হাতে ঝুলছে গামছায় বাধা ভাতের গামলা, শাক-চচ্চড়ি আর মাছের ঝোল। তার হাতে জলের ঘটি। দুপুর হয়ে এসেছে। খাঁ খাঁ করছে দুপুরের রোদ। স্নিগ্ধ হাওয়া খেলে যাচ্ছে সোনালী ফসলের উপর দিয়ে। চকচক করে উঠছে চাষিদের ফলানো সোনার ফসল।

ওদের মা-বাপ অপেক্ষা করছে বট গাছটার নীচে। কখন তাদের মেয়েরা খাবার নিয়ে যাবে আর তারা একসাথে চারজন বসে দুপুরের খাবার খাবে! সেই কোন সকালবেলা কাঠের জ্বালে রান্না করেছে দিদি দেবকী। তারপর অপেক্ষা করেছে বোনের স্কুল থেকে ফেরার। চিন্ময়ী স্কুল থেকে ফিরতেই পেটে খিদে নিয়ে দৌড় দিয়েছে তারা মাঠের দিকে। সেখানেই তাদের খিদে নিবারণ হয় প্রতিদিন, এইভাবেই।   

দরজায় টোকা পরতেই সেদিকে তাকালেন চিন্ময়ীদেবী। চোখের কোণে জমা জলগুলো একে একে নেমে এলো চিবুক বেয়ে। শাড়ির আঁচল দিয়ে সেগুলোকে মুছে হাসিমুখে দরজা খুললেন তিনি। সামনে দাঁড়িয়ে প্রভা। তাদের একমাত্র মেয়ে। ছাপা শাড়ি পরে, হাতে কাজললতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটা। ঠিক যেন সেই একই চোখ, একই মুখ, একই নম্রতা।

মুচকি হাসলেন তিনি। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে দেবকীদেবী, তাঁর দিদি। কনের বেশে। কি সুন্দর লাগছে আজ দিদিকে। কিন্তু মা-বাবা একেবারেই খুশি নয় দিদির বিয়েতে। কারণ, দিদি মা-বাবার অপছন্দের একটি ছেলেকে নিজের ইচ্ছেয় পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। মা চিৎকার করে বলছেন, যে ছেলের হাত ধরে তুই আজ আমাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে বিয়ে করে এলি, সেই ছেলে একদিন তোর হাত ধরে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দেবে। তখন এই মা-বাপের কথা মনে পড়বে তোর। সুখী হতে পারবিনা তুই দেবকী, সুখী হতে পারবিনা।”

“মা, তোমায় সবাই নীচে ডাকছে। সব তৈরি; তাড়াতাড়ি এসো।” প্রভার কথায় ঘোর কাটল চিন্ময়ীদেবীর। তিনি মেয়েকে নিয়ে নীচে এলেন। বাড়ির বাকি সবাই মিলে প্রভার আইবুড়ো ভাতের খাবার সাজিয়ে ফেলেছে। সামনের আসনে বসে নিজের হাতে মেয়েকে আইবুড়ো ভাত খাওয়ালেন তিনি। ঠিক যেমন তাঁর বিয়ের সময় দিদি তাকে খাইয়েছিল।

দেবকীদেবীর বিয়ের একবছরের মধ্যেই তাঁর কোল আলো করে আসে একটি কন্যাসন্তান। আর তারপরেই ঘটে বিপত্তি। কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়াতে তাঁর উপর চলতে থাকে অকথ্য অত্যাচার। কিন্তু সেই অত্যাচারের সীমা একদিন অতিক্রম করেন দেবকীদেবী। মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে আসেন বাপের বাড়ি। মা-বাপ ভিজে চোখে অভিমান ফেলে মেয়ে-নাতনীকে সানন্দে ঘরে তোলেন। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে অপেক্ষা করছিল আরও বড় এক বিপদ। হয়ত সেদিন মায়ের দেওয়া অভিশাপটা লেগে গিয়েছিল দেবকীদেবীর। ধীরে ধীরে জয়াযুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি। মাসিকের সময় নোংরা কাপড় ব্যবহার, সেই সময়েও মাতাল স্বামীর অ-সংরক্ষিত যৌন অত্যাচার তাঁর জীবনে ডেকে আনে সেই মারণরোগ।

এদিকে চিন্ময়ীদেবীর বিয়ে হয় কলকাতার ছেলে রজতকুমার বসাকের সঙ্গে। সম্ভ্রান্ত পরিবার রজতবাবুদের, কিন্তু সেখানেও আসে বিপত্তি। চিন্ময়ীদেবী একদিন জানতে পারেন তিনি কোনদিন মা হতে পারবেন না। কারণ, তিনি এন্ডোমেট্রিওসিস সিস্ট রোগে আক্রান্ত।

বসাক বাড়িতে শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। রজতবাবুর বাড়ির লোকেরা ছেলের নতুন বিয়ের তোড়জোড় শুরু করেন। কিন্তু সেই বিয়েকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন রজতবাবু। বন্ধ্যত্বের কোন আক্ষেপ চিন্ময়ীদেবীর প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে কম করতে পারে না। তিনি নিজের নতুন দোকান খোলেন বেহালাতে। নতুন করে সংসার গড়েন তাঁরা।

প্রভার ডাকে ঘোর কাটে চিন্ময়ীদেবীর। চোখের জল মুছে তিনি বলেন, আমার ঘরে একবার আয় তো মা। তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে!

মায়ের চোখে জল দেখে প্রভা মা’কে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না মা। দীপ্তকে বলে দাও ওকে ঘর জামাই থাকতে হবে।

চিন্ময়ীদেবী হেসে বলেন, পাগল মেয়ে আমার। তারপরেই মেয়ের হাত ধরে নিজের ঘরে চলে যান তিনি। রজতবাবু কানের কাছে এসে বলেন, বেস্ট অফ লাক। আমি জানি তুমি জিতবে।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেন চিন্ময়ীদেবী। মেয়েকে কাঁধে হাত দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেন। তারপর গয়নার বাক্স খুলে একে একে বের করেন সব গয়না। সেগুলোর থেকে বেছে নেন বালা-জোড়া। মেয়ের হাতে পরিয়ে দেন। তারপর ছলছল চোখে তাকান মেয়ের দিকে। তখনও প্রভার মুখে এক অদ্ভুত আনন্দের হাসি খেলা করছে।

মুখটা নিচু করে নেন চিন্ময়ীদেবী। মনে পড়ে যায় সেইদিনের কথা, যেদিন মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তাঁর হাতে নিজের আড়াই বছরের মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন দেবকীদেবী। চিন্ময়ীদেবীর হাতে এই বালা-জোড়া দিয়ে তিনি বলেছিলেন, আমার সংসার করার স্বপ্নটা যদিও পূরণ হলনা। কিন্তু এখানকার মত সেখানেও আমার এক মা ছিলেন, আমার শ্বাশুড়ি মা। নিজের ছেলের বউ হিসেবে মুখ দেখতে আমাকে এই বালা-জোড়া উপহার দিয়েছিলেন। আজ আমি এটা তোকে দিয়ে গেলাম বোন। আমার মেয়ে যখন বড় হবে, ওর বিয়ের দিন এটা আমার আশীর্বাদস্বরুপ ওর হাতে পরিয়ে দিস। রজতবাবুর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, জামাই, আমার মেয়েটাকে নিজেদের মেয়ের মত করে ভালবেসো। আজ থেকে তোমরাই ওর বাবা-মা।

মায়ের থুতনিটা ধরে মুখটা উপরে তোলে প্রভা। তার হাতে গড়িয়ে পরে কয়েক-ফোঁটা জল। হাসিমুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে সে বলে, অত ভেবোনা মা। তুমিই আমার মা। যে গেছে সে তো দেবকী ছিল। আমি না-হয় কৃষ্ণ নাই হলাম, কিন্তু তুমি তো আমার যশোদা মা। এ কথা আর নিজের মুখে তোমাকে বলতে হবে না। আমি সবটাই জানি। আমার দেবকী মায়ের এই আশীর্বাদ আমি মাথা পেতে নিলাম বটে, কিন্তু আমার মা যশোদাই ছিলেন, আর থাকবেন। চিন্ময়ী-দেবী হাউহাউ করে কেঁদে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। প্রভার মুখে তখনও সেই হাসি অক্ষত কিন্তু চোখ আঁটকে আছে সেই বালা-জোড়ার দিকে; তার দেবকী মায়ের দেওয়া উপহার। 

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন