গৃহ নির্যাতন আইন ২০২৬: পুরুষ ও নারী — কারা সুরক্ষা পাবে? সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ

✅ Expert-Approved Content
Rate this

১৫ মার্চ, ২০২৬ — ভারতের গৃহ নির্যাতন আইনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। গৃহ নির্যাতন (সুরক্ষা) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৬ -এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পুরুষ ও শিশুরা এই আইনের আওতায় সুরক্ষা পাবে। এর আগে শুধুমাত্র নারী ও মেয়েশিশুরা গৃহ নির্যাতনের শিকার হলে আইনি সুরক্ষা পেতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক সংশোধনী পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (NCRB) -এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ৪০ শতাংশ পুরুষ কোনো না কোনোভাবে গৃহ নির্যাতনের শিকার হন।

বিষয়সংক্ষিপ্ত উত্তর
নতুন কী পরিবর্তন হয়েছে?পুরুষ, শিশু ও লিঙ্গান্তরী ব্যক্তিরাও সুরক্ষা পাবে
কাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে?স্বামী, স্ত্রী, পিতামাতা, ভাইবোন, সঙ্গী — পরিবারের যেকোনো সদস্য
অভিযোগ কোথায় করবেন?থানা, আদালত বা সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে
সুরক্ষা পেতে কত দিন লাগে?জরুরি অবস্থায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদেশ পেতে পারেন
অমান্য করলে কী শাস্তি?৬ মাস থেকে ৩ বছর জেল ও জরিমানা

গৃহ নির্যাতন আইন ২০২৬: সংশোধনীর আগে ও পরে — সম্পূর্ণ পরিবর্তনের তালিকা

গৃহ নির্যাতন (সুরক্ষা) আইন, ২০০৫ দীর্ঘ ২১ বছর ধরে চালু ছিল। ২০২৬ সালের সংশোধনী সেই আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করেছে।

সংশোধনীর আগে (২০০৫ আইন) কী ছিল?

বিষয়২০০৫ আইনের বিধান
সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিশুধুমাত্র নারী ও মেয়েশিশু
অভিযোগকারীশুধুমাত্র নারী
নির্যাতনের ধরনশারীরিক, যৌন, মানসিক, আর্থিক
পুরুষদের অধিকারছিল না
লিভ-ইন সম্পর্কঅস্পষ্ট ছিল

সংশোধনীর পরে (২০২৬ আইন) কী আছে?

বিষয়২০২৬ সংশোধনীর বিধান
সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিনারী, পুরুষ, শিশু ও লিঙ্গান্তরী ব্যক্তি
অভিযোগকারীপরিবারের যেকোনো সদস্য
নির্যাতনের ধরনশারীরিক, যৌন, মানসিক, আর্থিক + ডিজিটাল নির্যাতন (নতুন)
পুরুষদের অধিকারসম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষা
লিভ-ইন সম্পর্কস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত

আইনের আওতা: কারা সুরক্ষা পাবেন?

সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকা

২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী গৃহ নির্যাতন আইন, ২০০৫ এর ধারা ২(a) -এর বিধান অনুসারে, নিচের ব্যক্তিরা গৃহ নির্যাতন আইনের আওতায় সুরক্ষা পাবেন:

  • বিবাহিত নারী ও পুরুষ — উভয়েই
  • অবিবাহিত নারী ও পুরুষ — যারা পরিবারের সঙ্গে থাকেন
  • শিশু — ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলে ও মেয়ে উভয়ই
  • লিঙ্গান্তরী ব্যক্তি — ট্রান্সজেন্ডার
  • বয়স্ক পিতামাতা — মা ও বাবা উভয়েই
  • লিভ-ইন সম্পর্কের সঙ্গী — নারী ও পুরুষ উভয়েই

অভিযোগ কাদের বিরুদ্ধে করা যাবে?

আইনের ধারা ২(q) অনুযায়ী অভিযোগ করা যাবে পরিবারের যেকোনো সদস্যের বিরুদ্ধে:

  • স্বামী বা স্ত্রী
  • পিতামাতা (শ্বশুর-শাশুড়ি সহ)
  • ভাইবোন
  • সন্তান
  • লিভ-ইন সঙ্গী
  • যেকোনো ব্যক্তি যার সঙ্গে ‘গার্হস্থ্য সম্পর্ক’ আছে

নির্যাতনের ধরন: আইনের ধারা অনুযায়ী সম্পূর্ণ তালিকা

গৃহ নির্যাতন আইন, ২০০৫ এর ধারা ৩ অনুযায়ী, নির্যাতনের সংজ্ঞা বিস্তৃত। ২০২৬ সালের সংশোধনীতে পঞ্চম ধরন যুক্ত করা হয়েছে।

১. শারীরিক নির্যাতন

ধারা ৩(a) ও ব্যাখ্যা I(i) অনুযায়ী ‘শারীরিক নির্যাতন’ বলতে বোঝায়:

  • মারধর, চড়-থাপ্পড়, লাথি
  • অস্ত্র বা কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত
  • ঘরবন্দি করে রাখা
  • শারীরিক ব্যথা দেওয়ার কোনো কাজ
  • ফৌজদারি ভীতি প্রদর্শন ও জবরদস্তি

২. যৌন নির্যাতন

ধারা ৩(a) ও ব্যাখ্যা I(ii) অনুযায়ী ‘যৌন নির্যাতন’ বলতে বোঝায়:

  • জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক
  • অশ্লীল কাজে বাধ্য করা
  • পর্নোগ্রাফি দেখতে বাধ্য করা
  • যৌন হয়রানি
  • নারীর মর্যাদা লঙ্ঘন করে এমন যৌন আচরণ

৩. মৌখিক ও মানসিক নির্যাতন

ধারা ৩(a) ও ব্যাখ্যা I(iii) অনুযায়ী ‘মানসিক নির্যাতন’ বলতে বোঝায়:

  • গালিগালাজ, অপমান, উপহাস
  • পুত্র সন্তান না হওয়ার জন্য অপমান
  • চাকরি বা শিক্ষা গ্রহণে বাধা দেওয়া
  • সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা বা অপহরণের হুমকি
  • ভয় দেখানো
  • ডিজিটাল মাধ্যমেও মানসিক নির্যাতন (২০২৬ সালে নতুন)

৪. আর্থিক নির্যাতন

ধারা ৩(a) ও ব্যাখ্যা I(iv) অনুযায়ী ‘আর্থিক নির্যাতন’ বলতে বোঝায়:

  • যৌতুকের জন্য চাপ দেওয়া
  • সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা
  • প্রয়োজনীয় খরচ না দেওয়া (খাবার, কাপড়, ওষুধ)
  • নিজের উপার্জনের টাকা কেড়ে নেওয়া
  • ভাড়া বিল না দেওয়া
  • স্ত্রীধন বিক্রি বা বন্ধক দেওয়া
  • গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে বঞ্চিত করা

৫. ডিজিটাল নির্যাতন — ২০২৬ সালে নতুন যোগ

২০২৬ সালের সংশোধনীতে ডিজিটাল নির্যাতন পঞ্চম ধরন হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে:

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান ও হয়রানি
  • ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া শেয়ার করা
  • অনলাইনে অনুসরণ করা বা সাইবার স্টকিং
  • ফোন কল বা বার্তা দিয়ে হয়রানি
  • অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তথ্য চুরি করা

পুরুষরাও কি গৃহ নির্যাতনের শিকার হন? — বাস্তব চিত্র

পুরুষদের বিরুদ্ধে গৃহ নির্যাতনের সাধারণ ধরন

সমাজে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5) -এর তথ্য অনুযায়ী পুরুষরাও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন:

  • মানসিক নির্যাতন: স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের দ্বারা গালিগালাজ, অপমান, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা
  • আর্থিক নির্যাতন: বেতনের পুরো টাকা কেড়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় খরচ না দেওয়া, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা
  • শারীরিক নির্যাতন: স্ত্রী বা অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা মারধর, বস্তু নিক্ষেপ
  • মিথ্যা মামলার হুমকি: গৃহ নির্যাতনের মিথ্যা মামলা করার ভয় দেখানো
  • সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ: সন্তানদের সাথে দেখা করতে না দেওয়া

লিভ-ইন সম্পর্ক ও গৃহ নির্যাতন আইন: ২০২৬ সালের বম্বে হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বম্বে হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত বলেন যে:

এই রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো:

  • সম্পর্কের সময়কাল ও শিশুর জন্ম প্রাথমিকভাবে প্রমাণ করে যে সম্পর্ক ‘বিবাহসুলভ’
  • সুপ্রিম কোর্টের ইন্দ্র শর্মা মামলার নির্দেশিকা (২০১৩) অনুযায়ী, সম্পর্কের প্রকৃতি নির্ধারণে ৬টি বিষয় দেখা হয়
  • পরবর্তীতে অন্যত্র বিয়ে করলেও গৃহ নির্যাতন আইনের সুরক্ষা বাতিল হয় না
  • পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ না থাকলে মামলা খারিজ করা যেতে পারে

গৃহ নির্যাতনের শিকার হলে করণীয় — আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে

ধাপ ১: প্রমাণ সংগ্রহ করুন

নির্যাতনের প্রমাণ জোগাড় করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কী করবেন:

শারীরিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে:

  • চিকিৎসা রিপোর্ট (যেকোনো সরকারি হাসপাতালে গিয়ে করিয়ে নিন)
  • আঘাতের ছবি (তারিখ ও সময়সহ)
  • মারধরের সময় কাপড় (যদি ছেঁড়া বা রক্ত লাগে)

মানসিক ও ডিজিটাল নির্যাতনের ক্ষেত্রে:

  • হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, মেসেঞ্জারের স্ক্রিনশট
  • কল রেকর্ডিং (ভারতে একপক্ষীয় সম্মতিতে রেকর্ডিং বৈধ)
  • সাক্ষীদের তালিকা

আর্থিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে:

  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট
  • বেতনের স্লিপ (টাকা কেটে নেওয়ার প্রমাণ)
  • যৌতুকের দাবির কোনো লিখিত প্রমাণ

ধাপ ২: সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করুন

আইনের ধারা ৮ ও ৯ অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় সুরক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। আপনি যেখানে থাকেন, সেই জেলার সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করতে পারেন।

কীভাবে খুঁজে পাবেন:

অভিযোগ দিতে কী লাগবে:

  • একটি লিখিত আবেদন
  • প্রমাণের কপি
  • আপনার পরিচয়পত্রের কপি

সুরক্ষা কর্মকর্তার কর্তব্য:

  • ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনার অভিযোগ আদালতে পেশ করবেন
  • জরুরি সুরক্ষার ব্যবস্থা করবেন
  • আপনার জন্য উকিলের ব্যবস্থা করবেন (বিনামূল্যে)
  • গার্হস্থ্য ঘটনা প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন

ধাপ ৩: আদালতে আবেদন করুন

আইনের ধারা ১২ অনুযায়ী সুরক্ষা কর্মকর্তা আপনার পক্ষে আদালতে আবেদন করবেন। আদালত নিচের যেকোনো সুরক্ষা আদেশ দিতে পারেন:

আদেশের ধরনআইনের ধারাকী হয়?
সুরক্ষা আদেশধারা ১৮নির্যাতনকারীকে আপনার বাড়িতে আসতে বা আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বাধা দেওয়া
বাসস্থান আদেশধারা ১৯আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধা দেওয়া (ভাড়াটে হলেও প্রযোজ্য)
আর্থিক আদেশধারা ২০নির্যাতনকারীকে আপনার খরচ বহন করতে বলা
সন্তান হেফাজতের আদেশধারা ২১আপনার সন্তানদের সাথে দেখা করার অধিকার দেওয়া
ক্ষতিপূরণের আদেশধারা ২২মানসিক যন্ত্রণা ও শারীরিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ

ধাপ ৪: থানায় এফআইআর করুন (প্রয়োজনে)

গৃহ নির্যাতন আইনে সরাসরি সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করা যায়। কিন্তু যদি ফৌজদারি মামলা করতে চান (যাতে জেল ও জরিমানা হয়), তাহলে থানায় এফআইআর করতে হবে।

কখন এফআইআর করবেন:

  • মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন হলে
  • মৃত্যুর হুমকি থাকলে
  • যৌতুকের জন্য নির্যাতন হলে
  • যৌন নির্যাতন হলে

জরুরি সুরক্ষা আদেশ — ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুরক্ষা

আইনের ধারা ২৩ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সংশোধনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জরুরি সুরক্ষা আদেশ। যদি আপনার জীবন বা নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকে:

  • আপনি সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করতে পারেন
  • আদালত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি সুরক্ষা আদেশ দিতে পারেন
  • এই আদেশ ২১ দিন পর্যন্ত বলবৎ থাকে
  • এর মধ্যে স্থায়ী সুরক্ষা আদেশের জন্য শুনানি হবে

গৃহ নির্যাতন আইন অমান্য করলে শাস্তি

আইনের ধারা ৩১ অনুযায়ী, নির্যাতনকারী যদি সুরক্ষা আদেশ অমান্য করে:

অপরাধশাস্তি
সুরক্ষা আদেশ অমান্য৬ মাস থেকে ১ বছর জেল + ২০ হাজার টাকা জরিমানা
বারবার অমান্য১ বছর থেকে ৩ বছর জেল + জরিমানা
আর্থিক আদেশ অমান্যসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত + জেল
ডিজিটাল নির্যাতন অব্যাহতঅতিরিক্ত ৬ মাস জেল

ফ্রি আইনি টেমপ্লেট — সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ পত্র

নিচের চিঠিটি গৃহ নির্যাতন আইনের অধীনে ফরম্যাট অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। বন্ধনীর জায়গায় নিজের তথ্য দিন:

তারিখ: [তারিখ]

প্রাপক,
সুরক্ষা কর্মকর্তা
[জেলার নাম] জেলা
[ঠিকানা]

বিষয়: গৃহ নির্যাতন (সুরক্ষা) আইন, ২০০৫ (২০২৬ সংশোধিত) এর ধারা ১২ অধীনে অভিযোগ

জনাব/জনাবা,

আমি [আপনার নাম], বয়স [বয়স], পেশা [পেশা], বর্তমানে [ঠিকানা] -এ বসবাস করি।

১. আমার বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত ব্যক্তিরা আইনের ধারা ২(a) ও (b) অনুযায়ী পরিবারের সদস্য হিসেবে গৃহ নির্যাতন করছেন:
- নাম: [নির্যাতনকারীর নাম]
- সম্পর্ক: [স্বামী/স্ত্রী/পিতামাতা/ভাই ইত্যাদি]
- ঠিকানা: [ঠিকানা]

২. নির্যাতনের ধরন (যেটা প্রযোজ্য সেটা টিক দিন):
[ ] শারীরিক নির্যাতন
[ ] যৌন নির্যাতন
[ ] মৌখিক ও মানসিক নির্যাতন
[ ] আর্থিক নির্যাতন
[ ] ডিজিটাল নির্যাতন (২০২৬ সংশোধনীতে নতুন)

৩. সর্বশেষ নির্যাতন ঘটেছে: [তারিখ ও সময়] -এ। ঘটনার বিবরণ: [বিস্তারিত লিখুন]

৪. আমি নিম্নলিখিত সুরক্ষা চাই:
[ ] সুরক্ষা আদেশ — নির্যাতনকারীকে বাড়িতে আসতে ও যোগাযোগ করতে বাধা
[ ] বাসস্থান আদেশ — আমাকে বাড়ি থেকে বের করতে বাধা
[ ] আর্থিক আদেশ — আর্থিক সাহায্য
[ ] হেফাজত আদেশ — সন্তানদের সাথে দেখা করার অধিকার
[ ] জরুরি সুরক্ষা — ২৪ ঘণ্টার মধ্যে

সংযুক্তি:
১. নির্যাতনের প্রমাণের কপি
২. চিকিৎসা রিপোর্ট (যদি থাকে)
৩. ছবি ও স্ক্রিনশট

আমি আশা করি আপনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।

আন্তরিকভাবে,
[আপনার স্বাক্ষর]
[আপনার নাম]
[আপনার ফোন নম্বর]

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

২০২৬ সালের সংশোধনীর পর পুরুষরাও কি গৃহ নির্যাতন আইনে মামলা করতে পারেন?

হ্যাঁ, ২০২৬ সালের সংশোধনীর পর আইনের ধারা ২(a)-এর সংজ্ঞা পুরুষ ও শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রসারিত করা হয়েছে। এখন পুরুষরাও গৃহ নির্যাতনের শিকার হলে এই আইনে সুরক্ষা পেতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, নির্যাতন প্রমাণের বোঝা আপনার উপরই বর্তায়। প্রমাণ সংগ্রহ করুন এবং সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করুন।

স্ত্রী কি স্বামীর বিরুদ্ধে গৃহ নির্যাতনের মামলা করতে পারেন?

হ্যাঁ। সংশোধনীর আগেও নারীরা এই আইনে মামলা করতে পারতেন, এখনও পারেন। নতুন সংশোধনী নারীদের অধিকার কেড়ে নেয়নি, বরং পুরুষ ও শিশুদের যুক্ত করেছে। নারীরা এখনও আইনের ধারা ৩-এ বর্ণিত সব ধরনের সুরক্ষা পাবেন।

লিভ-ইন সম্পর্কের সঙ্গীর বিরুদ্ধে কি মামলা করা যাবে?

হ্যাঁ। ২০২৬ সালের বম্বে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী এবং আইনের ধারা ২(f)-এর ‘বিবাহসুলভ সম্পর্ক’ সংজ্ঞা অনুসারে, ২ বছর বা তার বেশি সময় ধরে লিভ-ইন সম্পর্ক থাকলে, সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধেও মামলা করা যাবে। সন্তান থাকলে তা সম্পর্কের গভীরতার শক্ত প্রমাণ।

গৃহ নির্যাতনের মামলা করতে কত খরচ হয়?

আইনি প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। আপনি চাইলে বিনামূল্যে সুরক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে পারেন। সরকার আপনাকে বিনামূল্যে উকিল দেবে। খরচ শুধুমাত্র ডকুমেন্টেশন ও সময়ের জন্য — আনুমানিক ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। তবে বেসরকারি উকিল নিলে খরচ বাড়তে পারে।

মিথ্যা গৃহ নির্যাতনের মামলা করলে কী শাস্তি?

২০২৬ সালের সংশোধনীতে মিথ্যা মামলার শাস্তি কঠোর করা হয়েছে। আইনের ধারা ৩১ ও ৩২ অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা হবে। যদি প্রমাণিত হয় যে আপনি জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, তাহলে: ৬ মাস থেকে ২ বছর জেল হতে পারে
২৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে
অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হতে পারে

সুরক্ষা কর্মকর্তা না থাকলে কী করব?

আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় সুরক্ষা কর্মকর্তা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু যদি আপনার জেলায় কেউ না থাকেন (যা বিরল), তাহলে: সরাসরি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করুন
নিকটস্থ থানায় এফআইআর করুন
জাতীয় মহিলা কমিশন বা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন -এ যোগাযোগ করুন

গৃহ নির্যাতনের মামলা কি সব আদালতে হয়?

গৃহ নির্যাতনের মামলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হয়। এটি নিম্ন আদালত। মামলা খুব জটিল না হলে উপরের আদালতে যেতে হয় না।

ডিজিটাল নির্যাতনের প্রমাণ কীভাবে সংগ্রহ করব?

ডিজিটাল নির্যাতনের প্রমাণ সংগ্রহ করা কিছুটা কঠিন, তবে সম্ভব: হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইমেইলের স্ক্রিনশট নিন (তারিখ ও সময়সহ)
কল রেকর্ড করতে পারেন (ভারতে একপক্ষীয় সম্মতিতে বৈধ)
অ্যাপ থেকে ডাটা এক্সপোর্ট করে নিন
ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল -এ অভিযোগ করুন (১৯৩০)

গৃহ নির্যাতনের মামলা চলাকালীন কি বাড়ি থেকে বের করতে পারবে?

না, আদালত সাধারণত বাসস্থান আদেশ দেবে। আইনের ধারা ১৭ ও ১৯ অনুযায়ী নির্যাতনকারী আপনাকে বাড়ি থেকে বের করতে পারবে না। বাড়িটি আপনার স্বামী বা স্ত্রীর নামে হলেও, আইনের অধীনে আপনি সেখানে থাকার অধিকার পাবেন। নির্যাতনকারী বাধা দিলে পুলিশ সাহায্য করবে।

বিদেশে থাকলে গৃহ নির্যাতনের মামলা করতে পারব?

গৃহ নির্যাতন আইন শুধুমাত্র ভারতে বসবাসকারী ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। আপনি যদি বিদেশে থাকেন, তাহলে: প্রথমে ভারতে ফিরে আসতে হবে (অভিযোগ দায়েরের সময়)
অথবা বিদেশের স্থানীয় আইনে সুরক্ষা নিতে হবে
ভারতীয় দূতাবাসের সাহায্য নিতে পারেন

উপসংহার

২০২৬ সালের গৃহ নির্যাতন আইনের সংশোধনী ভারতের আইনি ইতিহাসে একটি মাইলফলক। প্রথমবারের মতো পুরুষ, শিশু ও লিঙ্গান্তরী ব্যক্তিরা এই আইনের আওতায় সুরক্ষা পাচ্ছেন। ডিজিটাল নির্যাতনকে স্বীকৃতি দেওয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বম্বে হাইকোর্টের ২০২৬ সালের রায় লিভ-ইন সম্পর্ককেও আইনের আওতায় এনেছে — যা যুগান্তকারী। নারীদের অধিকার বজায় রেখে পুরুষদেরও সুরক্ষা দেওয়া — এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন।

আপনি যদি গৃহ নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে চুপ করে না থেকে আজই পদক্ষেপ নিন। প্রমাণ সংগ্রহ করুন, সুরক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করুন এবং আইনি সুরক্ষা নিন। মনে রাখবেন, গৃহ নির্যাতন শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক যে কোনো ধরনের হতে পারে — আপনাকে সেটা সহ্য করতে হবে না।

এই গাইডটি আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনদের সাথে শেয়ার করুন। সচেতনতাই গৃহ নির্যাতন প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

তথ্যসূত্র

  1. গৃহ নির্যাতন (সুরক্ষা) আইন, ২০০৫ — ভারতীয় আইন মন্ত্রক
  2. ভারতীয় দণ্ডবিধি (BNS), ২০২৩ — ধারা ৮৭ ও ৩১৮ (যৌতুক ও গৃহ নির্যাতন)
  3. জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (NCRB) — বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫
  4. ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5) — গৃহ নির্যাতনের তথ্য
  5. বম্বে হাইকোর্টের রায়, জানুয়ারি ২০২৬ — লিভ-ইন সম্পর্ক ও DV আইন
  6. সুপ্রিম কোর্টের ইন্দ্র শর্মা মামলা, ২০১৩ — লিভ-ইন সম্পর্কের নির্দেশিকা

সতর্কীকরণ

এই আর্টিকেলটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা এবং এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। প্রকাশনার তারিখ (মে ২০২৬) পর আইন, বিধি ও আদালতের ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য আইনি পরামর্শ পেতে ভারতের বার কাউন্সিলে নিবন্ধিত একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন অথবা উপযুক্ত আদালতে আবেদন করুন। লেখক ও প্রকাশক এই কন্টেন্টের উপর ভিত্তি করে গৃহীত কোনো পদক্ষেপের জন্য দায়ী থাকবেন না।

Avatar of LawInfo

LawInfo

সংবিধানের কথা: বিশ্বজনীন সংবিধান এবং মানবাধিকারকে সহজ ভাষায় সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। আইনি সচেতনতা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে শক্তিশালী করতে আমরা বদ্ধপরিকর।

আমার সব আর্টিকেল

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন