ফেরেশতা (মালায়িকা) হলেন আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি করা বিশেষ নূরানী সত্তা, যারা সর্বদা আল্লাহর আদেশ পালন করেন এবং কখনো অবাধ্য হন না। তারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ওহি পৌঁছে দেওয়া, রিজিক বণ্টন, আমল লিপিবদ্ধ করা, আত্মা কবজ করা এবং বিশ্বজগতের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামে ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর একটি।
ফেরেশতার সংজ্ঞা ও সৃষ্টির বিবরণ
ফেরেশতা আরবি “মালাক” শব্দের বহুবচন “মালায়িকা”। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের নূর (আলো) থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারা মানুষের মতো খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বিবাহ বা বংশবৃদ্ধি করেন না।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
“ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
—
ফেরেশতারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না এবং যে দায়িত্ব দেওয়া হয় তা যথাযথভাবে পালন করেন।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না এবং তাদের যা আদেশ করা হয় তা-ই পালন করে।”
— সূরা আত-তাহরিম ৬৬:৬
প্রধান ফেরেশতা ও তাদের দায়িত্ব
ইসলামী সূত্রে কয়েকজন ফেরেশতার নাম ও দায়িত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১. (আলাইহিস সালাম)
জিবরিল (আ.) ওহি বা আল্লাহর বার্তা নবীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তিনি ফেরেশতাদের মধ্যে অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন।
২. (আলাইহিস সালাম)
মীকাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে বৃষ্টি, উদ্ভিদ ও রিজিক সম্পর্কিত বিষয় পরিচালনা করেন।
৩. (আলাইহিস সালাম)
ইসরাফিল (আ.) কিয়ামতের দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার দায়িত্বে নিযুক্ত।
৪.
মালাকুল মাওত বা মৃত্যুর ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে মানুষের আত্মা কবজ করেন।
৫. কিরামান কাতিবিন
প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে দুইজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন, যারা তার ভালো ও মন্দ কাজ লিপিবদ্ধ করেন।
৬. মুনকার ও নাকির
কবরে মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার দায়িত্বে থাকা দুই ফেরেশতা।
৭. রিদওয়ান ও মালিক
রিদওয়ান (আ.) জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ক এবং মালিক (আ.) জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পরিচিত।
ফেরেশতা সম্পর্কে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ফেরেশতাদের সম্পর্কে ইসলামী শিক্ষায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়:
- তারা আল্লাহর ইবাদতে সর্বদা নিয়োজিত থাকেন।
- তাদের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি, যা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন।
- তারা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকেন।
- আল্লাহর অনুমতিতে তারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারেন।
- তারা মুমিনদের জন্য দোয়া করেন এবং আল্লাহর রহমতের সংবাদ নিয়ে আসেন।
- তারা আল্লাহর আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
- তারা কিয়ামত ও আখিরাত সম্পর্কিত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবেন।
কুরআন ও সহিহ হাদিসে ফেরেশতাদের শক্তি, আনুগত্য এবং মর্যাদা সম্পর্কে বহু বর্ণনা রয়েছে।
ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাসের গুরুত্ব ও প্রভাব
ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ইসলামের ছয়টি ঈমানের স্তম্ভের একটি।
ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাসের ফলে:
- আল্লাহর অদৃশ্য জগতের প্রতি ঈমান দৃঢ় হয়।
- মানুষের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
- ভালো কাজ করার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
- পাপ থেকে দূরে থাকার প্রেরণা পাওয়া যায়।
- কুরআন ও ওহির সত্যতার প্রতি বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হয়।
- আখিরাত সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
যখন একজন মুসলমান জানে যে তার প্রতিটি কাজ ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করছেন, তখন সে নিজের আচরণ ও আমলের ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়।
সম্পর্কিত প্রশ্ন
ফেরেশতা কি নারী না পুরুষ?
ইসলামে ফেরেশতাদের নারী বা পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয় না। তারা মানুষের মতো লিঙ্গভিত্তিক সত্তা নন। কুরআনে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদেরকে নারী মনে করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
ফেরেশতা কি পাপ করে?
না। ফেরেশতারা কখনো পাপ করেন না এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না। তারা সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেন।
ফেরেশতা কি মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে?
হ্যাঁ। আল্লাহর অনুমতিতে ফেরেশতারা মানুষের রূপ ধারণ করতে পারেন। কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে (আ.) মানবাকৃতিতে (আ.)-এর নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন হাদিসে ফেরেশতাদের মানব রূপে আগমনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
উপসংহার
ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার নূর থেকে সৃষ্ট সম্মানিত বান্দা, যারা সর্বদা তাঁর আদেশ পালন করেন। ওহি পৌঁছে দেওয়া, আমল লিপিবদ্ধ করা, আত্মা কবজ করা এবং বিশ্বজগতের বিভিন্ন বিষয় পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাদের ওপর ন্যস্ত। ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ইসলামী ঈমানের একটি মৌলিক অংশ, যা একজন মুসলমানকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল, সচেতন এবং নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করে।