সীমিত ওভারের ক্রিকেট ম্যাচ (যেমন ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি) চলাকালীন হঠাৎ বৃষ্টি নামলে কিংবা অন্য কোনো কারণে খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে সবার আগে যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো— “এবার লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট কত হবে?”
এই জটিল সমস্যার বিজ্ঞানসম্মত ও নিখুঁত সমাধান দিতে ক্রিকেটে ব্যবহৃত হয় বিশ্বখ্যাত পদ্ধতি— DLS Method। কিন্তু আপনি কি জানেন DLS-এর পূর্ণরূপ কি? এটি কীভাবে কাজ করে? বৃষ্টির কারণে ওভার কমে গেলে গাণিতিক প্রক্রিয়ায় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে বের করা হয়? এই নিবন্ধে DLS পদ্ধতির পূর্ণরূপ, এর বাংলা অর্থ, ঐতিহাসিক ইতিহাস, গাণিতিক হিসাব এবং এর খুঁটিনাটি সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
DLS-এর পূর্ণরূপ ও এর প্রকৃত অর্থ কী?
DLS-এর ইংরেজি পূর্ণরূপ হলো Duckworth-Lewis-Stern Method।
- DLS Full Form: Duckworth-Lewis-Stern Method
- বাংলা অর্থ ও নামকরণ: ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতি। (উল্লেখ্য: ‘ডাকওয়ার্থ’, ‘লুইস’ ও ‘স্টার্ন’ হলো তিনজন প্রখ্যাত গণিতবিদ ও পরিসংখ্যানবিদের নাম, যাদের নামেই এই বিশেষ গাণিতিক পদ্ধতির নামকরণ করা হয়েছে)।
- উদ্ভাবক: ফ্রাঙ্ক ডাকওয়ার্থ (Frank Duckworth), টনি লুইস (Tony Lewis) এবং পরবর্তীতে আধুনিকায়নকারী স্টিভেন স্টার্ন (Steven Stern)।
- ব্যবহারের ক্ষেত্র: ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচ (আইসিসির সদস্য দেশসমূহ ও আইপিএল)।
এটি মূলত সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বৃষ্টি বা আলোর স্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ থাকলে, দুই দলের হাতে থাকা সুযোগের (Resource) ওপর নির্ভর করে বিজয়ী দল বা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা (Revised Target) নির্ধারণ করার আইসিসি অনুমোদিত গাণিতিক নিয়ম।
DLS পদ্ধতির ইতিহাস ও ব্যবহারের সঠিক পরিসংখ্যান
একসময় বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে অন্যায্য ও বিতর্কিত নিয়ম ব্যবহার করা হতো (যেমন ১৯৯২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ বলের লক্ষ্য ২২ রান করে দেওয়া হয়েছিল)। এই বিতর্ক দূর করতে দুই ইংরেজ পরিসংখ্যানবিদ ফ্রাঙ্ক ডাকওয়ার্থ এবং টনি লুইস ১৯৯৬ সালে এই গাণিতিক সূত্র উদ্ভাবন করেন।
ঐতিহাসিক প্রথম ব্যবহারের সঠিক তথ্য:
- প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যবহারের তারিখ: ১ জানুয়ারি, ১৯৯৭
- ভেনু: হারারে স্পোর্টস ক্লাব, জিম্বাবুয়ে
- প্রতিপক্ষ দুটি দল: জিম্বাবুয়ে বনাম ইংল্যান্ড (দ্বিপক্ষীয় ওডিআই সিরিজ)
- ম্যাচের ফলাফল: ডিএল (D/L) পদ্ধতিতে জিম্বাবুয়ে ম্যাচটিতে ৭ রানে জয়লাভ করে।
- আইসিসি কর্তৃক অফিশিয়াল অনুমোদন: ১৯৯৯ সালে আইসিসি (ICC) আনুষ্ঠানিকভাবে একে তাদের প্রধান নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করে।
- নাম পরিবর্তন (D/L থেকে DLS): অস্ট্রেলীয় অধ্যাপক স্টিভেন স্টার্ন টি-টোয়েন্টির যুগের সাথে মিলিয়ে ২০১৫ সালে সূত্রটি আধুনিকায়ন করার পর নাম হয় DLS।
আন্তর্জাতিক ও আইপিএল ম্যাচে DLS ব্যবহারের পরিসংখ্যান:
- ওডিআই (ODI) ক্রিকেট: আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে আজ পর্যন্ত আনুমানিক ৩০০+ ম্যাচে এই পদ্ধতির সাহায্যে ম্যাচের ফলাফল বা লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।
- টি-টোয়েন্টি (T20 International & Leagues): আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট শুরু হওয়ার পর থেকে এবং বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগসহ সব ধরনের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৭০০-এর বেশি ম্যাচে এই নিয়মটি ব্যবহার করা হয়েছে।
- আইপিএল (IPL): ইন্ডিয়ান প্রিমিিয়ার লিগের (IPL) ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০টিরও বেশি ম্যাচে ডিএলএস (বা আগের ডিএল) মেথড ব্যবহার করে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। (যেমন: ২০২৩ সালের আইপিএল ফাইনাল ম্যাচটি বৃষ্টিতে বাধাগ্রস্ত হলে চেন্নাই সুপার কিংসকে এই DLS মেথডেই ১৫ ওভারে ১৭১ রানের সংশোধিত লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল, যা তারা সফলভাবে তাড়া করে চ্যাম্পিয়ন হয়।)
DLS মেথডের মূল ভিত্তি: “রিসোর্স বা সম্পদ” (Resources)
DLS পদ্ধতি মূলত দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে:
- বাকি থাকা ওভার (Overs Remaining): ইনিংসে আর কত ওভার খেলা বাকি আছে।
- হাতে থাকা উইকেট (Wickets in Hand): দলের পতন হওয়া উইকেটের বিপরীতে আর কতটি উইকেট সুরক্ষিত আছে।
একটি ব্যাটিং দলের কাছে ৫০ ওভারের শুরুতে ১০০% রিসোর্স থাকে। ওভার কমতে থাকলে এবং উইকেট পড়তে থাকলে এই রিসোর্সের শতাংশ কমতে থাকে। DLS-এর অফিসিয়াল রিসোর্স টেবিল (Resource Table)-এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় কোন দলের হাতে ঠিক কত শতাংশ সুযোগ বা রিসোর্স বাকি আছে।
DLS লক্ষ্যমাত্রা বের করার গাণিতিক সূত্র ও সম্পূর্ণ ক্যালকুলেশন
WTC বা NRR-এর মতো DLS পদ্ধতিতেও একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
DLS সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মূল সূত্র:
সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা (Revised Target) = (প্রথম দলের মোট রান × দ্বিতীয় দলের ব্যবহৃত রিসোর্স %) ÷ প্রথম দলের ব্যবহৃত রিসোর্স %
সংখ্যার সাহায্যে ধাপে ধাপে সহজ ক্যালকুলেশন:
ধরা যাক, একটি ওয়ানডে ম্যাচে ভারত প্রথমে ব্যাটিং করছে এবং অস্ট্রেলিয়া রান তাড়া করছে।
- ধাপ ১ (প্রথম ইনিংসে ভারতের পারফরম্যান্স):
- ভারত পুরো ৫০ ওভার খেলে ৫ উইকেটে ২৫০ রান করল।
- অর্থাৎ, ভারত তাদের হাতে থাকা ১০০% রিসোর্স (Resource) ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছে।
- ধাপ ২ (বৃষ্টির কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে বাধা):
- অস্ট্রেলিয়া যখন ব্যাট করতে নামবে, তখন দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টির কারণে ম্যাচ থেকে ২০ ওভার কেটে নেওয়া হলো।
- অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়াকে এখন ৫০ ওভারের জায়গায় খেলার সুযোগ দেওয়া হবে ৩০ ওভার (হাতে ১০টি উইকেটই অক্ষত আছে)।
- DLS অফিশিয়াল রিসোর্স চার্ট অনুযায়ী, ১০টি উইকেট হাতে নিয়ে ৩০ ওভারের রিসোর্স হলো ৭৫.১%।
- ধাপ ৩ (সূত্রে মান ও নম্বর বসিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নতুন টার্গেট বের করা):
- প্রথম দলের (ভারত) অর্জিত রান = ২৫০প্রথম দলের (ভারত) ব্যবহৃত রিসোর্স = ১০০%দ্বিতীয় দলের (অস্ট্রেলিয়া) প্রাপ্য রিসোর্স = ৭৫.১%
গাণিতিক হিসাবের ধাপসমূহ:
গুণফল: ২৫০ × ৭৫.১ = ১৮,৭৭৫
ভাগফল: ১৮,৭৭৫ ÷ ১০০ = ১৮৭.৭৫
পূর্ণসংখ্যা গ্রহণ: ক্রিকেটে ভগ্নাংশ রান সম্ভব নয়। তাই ১৮৭.৭৫-এর নিকটতম পরবর্তী পূর্ণসংখ্যা হলো ১৮৮।
ফলাফল: ৩০ ওভারে ম্যাচ জিততে হলে অস্ট্রেলিয়ার নতুন সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা (Revised Target) হবে ১৮৮ রান।
DLS খেলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ওভারের নিয়ম (Minimum Overs)
একটি ম্যাচে DLS পদ্ধতি কার্যকর করার জন্য উভয় দলকে নির্দিষ্ট একটি ওভার পার হতে হয়:
- টি-টোয়েন্টি ম্যাচ (T20I / IPL): DLS-এর মাধ্যমে ফল প্রকাশ করতে হলে দ্বিতীয় ইনিংসে অন্তত ৫ ওভার খেলা সম্পন্ন হতে হবে। এর কম হলে ম্যাচটি “No Result” বা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
- একদিনের ম্যাচ (ODI): ফল নির্ধারণের জন্য দ্বিতীয় ইনিংসে সাধারণত অন্তত ২০ ওভার খেলা সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
DLS-এর পূর্ণরূপ কী?
DLS-এর পূর্ণরূপ হলো Duckworth-Lewis-Stern Method। বাংলায় একে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতি বলা হয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম কোন দুটি দলের মধ্যে DLS ব্যবহার করা হয়েছিল?
১ জানুয়ারি, ১৯৯৭ সালে জিম্বাবুয়ে বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যকার একদিনের আন্তর্জাতিক (ODI) ম্যাচে প্রথমবারের মতো এই পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট কতটি দল এই নিয়মের আওতায় খেলে?
আইসিসির অনুমোদিত টেস্ট ও সীমিত ওভারের প্রধান ৯টি টেস্ট খেলুড়ে দেশ (ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশ) এবং অন্যান্য সহযোগী সদস্য দেশগুলোর যেকোনো আন্তর্জাতিক সীমিত ওভারের ম্যাচে এই নিয়ম প্রযোজ্য হয়।
DLS পদ্ধতি কি টেস্ট ক্রিকেটে ব্যবহার করা হয়?
না, DLS পদ্ধতি কেবল সীমিত ওভারের ক্রিকেট ম্যাচ (যেমন ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি)-এর জন্য প্রযোজ্য। টেস্ট ক্রিকেটে সময়ের খেলা হওয়ায় এর প্রয়োজন হয় না।
পার স্কোর (Par Score) বলতে কী বোঝায়?
দ্বিতীয় ইনিংসে খেলা চলাকালীন হঠাৎ বৃষ্টি নামলে DLS সূত্রের সাহায্যে তৎকালীন ওভার ও উইকেটের ওপর নির্ভর করে যে রান নির্ধারণ করা হয়, তাকে Par Score বলা হয়। ওভার শেষে ব্যাটিং দল Par Score-এর চেয়ে এগিয়ে থাকলে জয়ী ঘোষিত হয়।
Your comment will appear immediately after submission.