লেখা সাধারণ জ্ঞান ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। সরকারি পাঠের জন্য ইন্ডিয়া কোড ও সংসদের ওয়েবসাইট দেখুন।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়। এর রচয়িতারা ইচ্ছে করেই একে এমন করে গড়েছিলেন, যাতে তা একেবারে অনমনীয়ও না হয়, আবার সহজে বদলেও না যায়। ছিয়াত্তর বছর পরে এসে সংবিধান সংশোধিত হয়েছে ১০৬ বার, আর প্রতিটি সংশোধনীর পেছনে একটি করে গল্প আছে: ভূমি সংস্কারের লড়াই, জরুরি অবস্থার অন্ধকার, গ্রামকে নিজস্ব সরকার দেওয়ার উদ্যোগ, একটি জাতীয় কর, নারীদের প্রতিশ্রুতি। কিছু সংশোধনী দেশের মানচিত্র বদলেছে। কিছু সংসদ ও আদালতের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে লিখেছে, আর একটি বাতিলই হয়ে গেছে বিচারবিভাগের স্বাধীনতায় আঘাত করার কারণে।
এই লেখায় ধারাবাহিকভাবে প্রধান সংশোধনীগুলো, সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের আলোচিত বিলগুলো তুলে ধরা হলো। এর মধ্যে আছে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১৩১তম সংশোধনী বিলের পরাজয়ের খবরও, যা পুরোনো গাইডগুলোতে পাওয়া যায় না।
ভারতীয় সংবিধান সংশোধন: এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মোট সংশোধনী (আইনে পরিণত) | ১০৬টি (নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত) |
| প্রথম সংশোধনী | সংবিধান (প্রথম সংশোধনী) আইন, ১৯৫১ |
| সর্বশেষ সংশোধনী | ১০৬তম সংশোধনী আইন, ২০২৩ (নারী সংরক্ষণ) |
| সাংবিধানিক ভিত্তি | ধারা ৩৬৮ (বিংশ ভাগ) |
| সবচেয়ে বড় সংশোধনী | ৪২তম সংশোধনী (১৯৭৬), “মিনি সংবিধান” |
| সংশোধনের সীমা | “মৌলিক কাঠামো” মতবাদ (কেশবানন্দ ভারতী, ১৯৭৩) |
| বিচারাধীন বা ব্যর্থ বিল | ১২৯তম (এক দেশ, এক নির্বাচন) যৌথ সংসদীয় কমিটিতে; ১৩০তম কমিটিতে; ১৩১তম ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল লোকসভায় পরাজিত |
সংখ্যা নিয়ে একটি জরুরি কথা: একটি সংশোধনী আইনে পরিণত হওয়ার পরই সেটির ক্রমিক নম্বর পায়। বিলের নম্বর অনেক সময় আইনের নম্বরের চেয়ে অনেক বেশি হয়, কারণ বহু বিল কখনও পাস হয় না। যেমন ২০২৩ সালের ১০৬তম সংশোধনী আইনটি সংসদে এসেছিল ১২৮তম সংশোধনী বিল হিসেবে। এ কারণেই ১২৯, ১৩০ ও ১৩১ নম্বর বিল থাকলেও আইনের হিসাব এখনও ১০৬টিতেই আছে।
সংবিধান সংশোধন হয় কীভাবে
ধারা ৩৬৮ সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে। এর পথ মোট তিনটি।
১. সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (ধারা ৩৬৮-এর বাইরে)
কিছু বিষয় উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সাধারণ আইন দিয়েই বদলানো যায়। এগুলোকে ধারা ৩৬৮-এর অধীনে সংশোধনী ধরা হয় না। উদাহরণ: নতুন রাজ্যের সৃষ্টি বা অন্তর্ভুক্তি, রাজ্যের সীমানা ও নাম পরিবর্তন, রাজ্যে বিধান পরিষদ সৃষ্টি বা বিলোপ।
২. বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
মৌলিক অধিকার, নির্দেশমূলক নীতিসহ বেশির ভাগ সংশোধনীতে সংসদের প্রতিটি কক্ষে দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
- কক্ষের মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এবং
- উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন।
৩. বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজ্যগুলোর অনুমোদন
যেসব সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রভাবিত করে, সেগুলোতে অন্তত অর্ধেক রাজ্যের আইনসভার অনুমোদনও লাগে। এর মধ্যে আছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতা বণ্টন, সংসদে রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট এবং ধারা ৩৬৮ নিজেই। জিএসটি সংশোধনী (১০১তম) এর পরিচিত উদাহরণ।
মৌলিক কাঠামো মতবাদ
সংসদের সংশোধনের ক্ষমতা বিস্তৃত, তবে সীমাহীন নয়। ১৯৭৩ সালে কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা রাজ্য মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সংসদ সংবিধানের “মৌলিক কাঠামো” বদলাতে পারে না। পরে মিনার্ভা মিলস (১৯৮০) ও আই.আর. কোয়েলহো (২০০৭) মামলায় এই নীতি আরও বিস্তৃত হয়। এই মতবাদের ভিত্তিতে আদালত কয়েকটি সংশোধনীর অংশবিশেষ এবং একটি পুরো সংশোধনী বাতিল করেছে।
শুরুর বছরগুলো: ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশক
১ম সংশোধনী (১৯৫১): ভূমি সংস্কার ও বাকস্বাধীনতার সীমা
১৯৫১ সালের জুনে কার্যকর হওয়া প্রথম সংশোধনী এসেছিল ভূমি সংস্কার ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত কিছু আইন আদালতে বাতিল হওয়ার প্রতিক্রিয়ায়। এর মাধ্যমে:
- ৩১ক ও ৩১খ ধারা এবং নবম তপশিল যুক্ত হয়, যা তালিকাভুক্ত আইনগুলোকে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চ্যালেঞ্জ থেকে রক্ষা করে;
- ধারা ১৫(৪) যুক্ত হয়, যা সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ দেয়;
- ধারা ১৯(২)-এ বাকস্বাধীনতা সীমিত করার নতুন কারণ যুক্ত হয়: জনশৃঙ্খলা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অপরাধে উসকানি। এসব নিষেধাজ্ঞাকে “যুক্তিসংগত” হতে হবে বলে বলা হয়।
সামাজিক সংস্কারের পথ খুলে দেওয়ার জন্য এর প্রশংসা হয়েছে, আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিধিনিষেধের জন্য সমালোচনাও।
৪র্থ সংশোধনী (১৯৫৫): সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ
সম্পত্তি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্ন আদালতে তোলার সুযোগ বন্ধ করে।
৭ম সংশোধনী (১৯৫৬): রাজ্য পুনর্গঠন
রাজ্য পুনর্গঠন আইনের পর এই সংশোধনী ক-খ-গ-ঘ শ্রেণিতে রাজ্য ভাগ করার পুরোনো ব্যবস্থা বাতিল করে। এতে ১৪টি রাজ্য ও ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠিত হয়, মূলত ভাষার ভিত্তিতে। একাধিক রাজ্যের জন্য অভিন্ন হাইকোর্টও সম্ভব হয়।
ভূখণ্ডগত সংশোধনী (১৯৬০–১৯৬৩)
- ৯ম (১৯৬০): বেরুবাড়ি ইউনিয়নসহ কয়েকটি ছিটমহল নিয়ে ভারত-পাকিস্তান চুক্তি কার্যকর করে
- ১০ম (১৯৬১): দাদরা ও নগর হাভেলি অন্তর্ভুক্ত করে
- ১২শ (১৯৬২): গোয়া, দমন ও দিউ অন্তর্ভুক্ত করে
- ১৩শ (১৯৬২): নাগাল্যান্ডকে বিশেষ ব্যবস্থাসহ (ধারা ৩৭১ক) রাজ্য করে
- ১৪শ (১৯৬২): পুদুচেরি অন্তর্ভুক্ত করে
২১তম সংশোধনী (১৯৬৭): সিন্ধি ভাষা
সিন্ধিকে অষ্টম তপশিলে ১৫তম স্বীকৃত ভাষা হিসেবে যুক্ত করে।
১৯৭০-এর দশক: ক্ষমতা, সম্পত্তি ও জরুরি অবস্থা
২৪তম সংশোধনী (১৯৭১)
গোলকনাথ মামলার রায়ের পর আসা এই সংশোধনী ঘোষণা করে, মৌলিক অধিকারসহ সংবিধানের যেকোনো অংশ সংসদ সংশোধন করতে পারে। সংশোধনী বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতিও বাধ্যতামূলক করা হয়।
২৫তম সংশোধনী (১৯৭১)
সম্পত্তি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত ধারায় “ক্ষতিপূরণ” শব্দের জায়গায় “অর্থ” বসায় এবং ধারা ৩১গ যুক্ত করে, যার ফলে কয়েকটি নির্দেশমূলক নীতি কিছু মৌলিক অধিকারের ওপরে অগ্রাধিকার পায়।
২৬তম সংশোধনী (১৯৭১)
দেশীয় রাজন্যদের ভাতা (প্রিভি পার্স) ও বিশেষ সুবিধা বিলুপ্ত করে।
৩১তম ও ৩৬তম সংশোধনী (১৯৭৩ ও ১৯৭৫)
৩১তম সংশোধনীতে লোকসভার নির্বাচিত আসনের সর্বোচ্চ সংখ্যা ৫২৫ থেকে বেড়ে ৫৪৫ হয়। ৩৬তম সংশোধনীতে সিকিম ভারতের ২২তম রাজ্য হয়।
৩৯তম সংশোধনী (১৯৭৫)
প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধকে আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখে। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা নেহরু গান্ধী বনাম রাজ নারায়ণ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এর একটি অংশ বাতিল করে।
৪২তম সংশোধনী (১৯৭৬): “মিনি সংবিধান”
জরুরি অবস্থার সময় স্বরণ সিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পাস হওয়া ৪২তম সংশোধনী সংবিধানের যে পরিমাণ অংশ বদলেছে, অন্য কোনো সংশোধনী তা করেনি। এর মাধ্যমে:
- প্রস্তাবনায় “সমাজতান্ত্রিক”, “ধর্মনিরপেক্ষ” ও “অখণ্ডতা” শব্দ যুক্ত হয়;
- মৌলিক কর্তব্য (চতুর্থ-ক ভাগ, ধারা ৫১ক) চালু হয়;
- রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ মানতে বাধ্য হন;
- লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার মেয়াদ পাঁচ থেকে বেড়ে ছয় বছর হয়;
- সংবিধান সংশোধনের বিচারিক পর্যালোচনা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয় এবং নির্দেশমূলক নীতিকে মৌলিক অধিকারের ওপরে স্থান দেওয়া হয়;
- বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, শ্রমিকের ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ ও পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে নতুন নির্দেশমূলক নীতি যুক্ত হয়;
- শিক্ষা ও বনের মতো বিষয় যুগ্ম তালিকায় সরানো হয়।
পরে মিনার্ভা মিলস বনাম ভারত সরকার (১৯৮০) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বিচারিক পর্যালোচনা বন্ধ করার এবং নির্দেশমূলক নীতিকে সর্বোচ্চ করার ধারাগুলো বাতিল করে।
পাল্টা পদক্ষেপ: ৪৪তম সংশোধনী (১৯৭৮)
জরুরি অবস্থার অবসানের পর জনতা সরকার ৪২তমের বহু পরিবর্তন ফিরিয়ে নিতে এবং ভবিষ্যতে জরুরি অবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে ৪৪তম সংশোধনী আনে। এতে:
- লোকসভা ও বিধানসভার মেয়াদ আবার পাঁচ বছর হয়;
- জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণ হিসেবে “অভ্যন্তরীণ গোলযোগ”-এর বদলে “সশস্ত্র বিদ্রোহ” আসে এবং মন্ত্রিসভার লিখিত সুপারিশ বাধ্যতামূলক হয়;
- জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার (ধারা ২১) এবং দণ্ডসংক্রান্ত সুরক্ষা (ধারা ২০) জরুরি অবস্থাতেও স্থগিত করা যায় না;
- সম্পত্তির অধিকার মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাদ যায় এবং ধারা ৩০০ক-এর অধীনে সাধারণ আইনি অধিকারে পরিণত হয়।
শেষ পরিবর্তনটির কারণেই ভারতে সম্পত্তির অধিকার আজ আর মৌলিক অধিকার নয়।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক: দলত্যাগ, ভোটাধিকার ও তৃণমূল গণতন্ত্র
৫২তম সংশোধনী (১৯৮৫): দলত্যাগ বিরোধী আইন
দশম তপশিল যুক্ত করে, যার ফলে দল ছেড়ে যাওয়া আইনপ্রণেতাদের সদস্যপদ বাতিল হতে পারে। ১৯৯২ সালে কিহোতো হোলোহান মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এর বৈধতা বহাল রাখে।
৬১তম সংশোধনী (১৯৮৮): ভোটার বয়স কমানো
লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ভোটাধিকারের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করে।
৬৯তম সংশোধনী (১৯৯১): দিল্লি
জাতীয় রাজধানী অঞ্চল দিল্লির জন্য বিধানসভা ও মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ব্যবস্থা করে (ধারা ২৩৯কক)।
৭৩তম সংশোধনী (১৯৯২): পঞ্চায়েতি রাজ
গ্রামীণ স্থানীয় সরকারকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়। নবম ভাগ, ২৯টি বিষয়ের তালিকাসহ একাদশ তপশিল, নিয়মিত নির্বাচন এবং নারী ও তফসিলি জাতি-উপজাতির জন্য আসন সংরক্ষণ যুক্ত হয়। ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে এটি কার্যকর হয়।
৭৪তম সংশোধনী (১৯৯২): পৌরসভা
শহুরে স্থানীয় সরকারের জন্য একই কাজ করে: নবমক ভাগ এবং ১৮টি বিষয়ের তালিকাসহ দ্বাদশ তপশিল যুক্ত হয়। ১৯৯৩ সালের জুনে এটি কার্যকর হয়।
৭৩তম ও ৭৪তম সংশোধনী একসঙ্গে ভারতে সরকারের তৃতীয় স্তর তৈরি করেছে।
২০০০-এর দশক: শিক্ষা, মন্ত্রিসভার আকার ও সংরক্ষণ
৮৬তম সংশোধনী (২০০২): শিক্ষার অধিকার
ধারা ২১ক যুক্ত করে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার করে। সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া অভিভাবকদের মৌলিক কর্তব্য হিসেবেও যুক্ত হয়। ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন পাস হয়।
৯১তম সংশোধনী (২০০৩): মন্ত্রিসভার আকার ও দলত্যাগ
মন্ত্রিপরিষদের আকার সংশ্লিষ্ট কক্ষের সদস্যসংখ্যার ১৫ শতাংশে সীমিত করে এবং দলে বিভাজনের ছাড় তুলে দিয়ে দলত্যাগ বিরোধী আইন আরও কঠোর করে।
৯২তম সংশোধনী (২০০৩)
বোড়ো, ডোগরি, মৈথিলী ও সাঁওতালি ভাষাকে অষ্টম তপশিলে যুক্ত করে।
৯৩তম সংশোধনী (২০০৫)
বেসরকারি অনুদানহীন প্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি, তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ দেয় (ধারা ১৫(৫))।
২০১০-এর দশক: সমবায়, বিচারক নিয়োগ, সীমান্ত ও জাতীয় কর
৯৭তম সংশোধনী (২০১১): সমবায় সমিতি
সমবায় সংগঠনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়। ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য-পর্যায়ের সমবায়-সংক্রান্ত অংশটি বাতিল করে, কারণ তা প্রয়োজনীয়সংখ্যক রাজ্যের অনুমোদন পায়নি। তবে একাধিক রাজ্যে কাজ করা সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে তা বহাল থাকে।
৯৯তম সংশোধনী (২০১৪): এনজেএসি
কলেজিয়াম ব্যবস্থার বদলে বিচারক নিয়োগের জন্য জাতীয় বিচারিক নিয়োগ কমিশন (এনজেএসি) গঠন করে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে চতুর্থ বিচারক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এটি বাতিল করে। আদালতের মতে এতে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, যা মৌলিক কাঠামোর অংশ, লঙ্ঘিত হয়েছিল। কলেজিয়াম ব্যবস্থা এখনও চালু আছে।
১০০তম সংশোধনী (২০১৫): বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি
ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর করে এবং দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হয়। ভারত ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশকে দেয় এবং বিনিময়ে ৫১টি ফেরত পায়। এর ফলে বহু দশকের অনিশ্চয়তা ও নাগরিকত্বহীনতার অবসান ঘটে।
১০১তম সংশোধনী (২০১৬): পণ্য ও সেবা কর
জিএসটি চালু করে। এতে ধারা ২৪৬ক, ২৬৯ক ও ২৭৯ক এবং জিএসটি কাউন্সিল তৈরি হয়। রাজ্যগুলোর অনুমোদন লেগেছিল, আর ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়।
১০২তম সংশোধনী (২০১৮)
জাতীয় অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয় (ধারা ৩৩৮খ)।
১০৩তম সংশোধনী (২০১৯): ইডব্লিউএস সংরক্ষণ
বিদ্যমান সংরক্ষণ-বহির্ভূত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির জন্য শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সংরক্ষণ দেয় (ধারা ১৫(৬) ও ১৬(৬))। ২০২২ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ৩-২ ব্যবধানে এটি বহাল রাখে।
১০৪তম সংশোধনী (২০১৯)
লোকসভা ও বিধানসভায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য মনোনয়ন বন্ধ করে এবং আইনসভায় তফসিলি জাতি ও উপজাতির আসন সংরক্ষণ আরও দশ বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত করে।
২০২০-এর দশক: অনগ্রসর শ্রেণি ও নারী সংরক্ষণ
১০৫তম সংশোধনী (২০২১)
মারাঠা সংরক্ষণ-সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ১০২তম সংশোধনীর ব্যাখ্যায় রাজ্যের যে ক্ষমতা কার্যত চলে গিয়েছিল, তা ফিরিয়ে দেয়। রাজ্যগুলো আবার নিজস্ব প্রয়োজনে সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণি চিহ্নিত করতে পারে।
১০৬তম সংশোধনী (২০২৩): নারী সংরক্ষণ
নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম নামে পাস হওয়া এই সংশোধনীতে আছে:
- নতুন ধারা ৩৩০ক, ৩৩২ক ও ৩৩৪ক-এর মাধ্যমে লোকসভা, রাজ্য বিধানসভা ও দিল্লি বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ;
- এই কোটার ভেতরে তফসিলি জাতি ও উপজাতির নারীদের জন্য উপ-সংরক্ষণ;
- ১৫ বছরের মেয়াদ, যা সংসদ বাড়াতে পারে।
২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর লোকসভায় বিলটি ৪৫৪-২ ভোটে এবং পরদিন রাজ্যসভায় ২১৪-০ ভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেন।
আইনটি এই সংরক্ষণকে এর কার্যকর হওয়ার পরের প্রথম আদমশুমারি এবং সেই আদমশুমারির ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ কারণেই এখনও কোনো নির্বাচনে কোটা প্রয়োগ হয়নি, এবং ২০২৬ সালে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
২০২৪–২০২৬: যেসব বিল এখনও আলোচনায়
১২৯তম সংশোধনী বিল (এক দেশ, এক নির্বাচন)
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসা এই বিলের লক্ষ্য লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে করা। বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়, যা ২০২৬ জুড়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কমিটি জানায়, তারা কাঠামোটিকে সংবিধানসম্মত মনে করে। বিলটি এখনও আইনে পরিণত হয়নি।
১৩০তম সংশোধনী বিল (আটক অবস্থায় মন্ত্রীদের অপসারণ)
২০২৫ সালের আগস্টে আসা এই বিলে গুরুতর অভিযোগে দীর্ঘ সময় আটক থাকা প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের অপসারণের প্রস্তাব আছে। এটি সংসদীয় কমিটির কাছে আছে, আইনে পরিণত হয়নি।
১৩১তম সংশোধনী বিল (২০২৬): পরাজিত
২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল সরকার সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল এবং সঙ্গে একটি সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল পেশ করে। লক্ষ্য ছিল ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের সঙ্গে নারী সংরক্ষণকে যুক্ত করে তা আগেভাগেই কার্যকর করা, এবং লোকসভার সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা।
২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল বিলটি লোকসভায় পাস হয়নি। পক্ষে ২৯৮ ও বিপক্ষে ২৩০ ভোট পড়ে। উপস্থিত ও ভোটদানকারী ৫২৮ জন সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩৫২ ভোট দরকার ছিল। এরপর সরকার সঙ্গের দুটি বিল প্রত্যাহার করে নেয়।
বিতর্কে দুটি অবস্থান স্পষ্ট ছিল। সরকারের যুক্তি, পরবর্তী আদমশুমারি ও নতুন সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য অপেক্ষা করলে নারীদের প্রতিনিধিত্ব অকারণে পিছিয়ে যাবে। বিরোধী দলগুলো বলে, নারী সংরক্ষণকে তারা নীতিগতভাবে সমর্থন করে, কিন্তু আসনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সীমানা পুনর্নির্ধারণের সঙ্গে একে জুড়ে দেওয়ায় তাদের আপত্তি। দক্ষিণের কয়েকটি রাজ্যের দলসহ বেশ কয়েকটি দল এতে প্রতিনিধিত্বে প্রভাব পড়ার উদ্বেগ তোলে। বিল ব্যর্থ হওয়ায় ১০৬তম সংশোধনীই এখনও সর্বশেষ আইনে পরিণত সংশোধনী, এবং এর মূল শর্তগুলো বহাল আছে।
দ্রুত দেখে নেওয়ার তালিকা: প্রধান সংশোধনী
| সংশোধনী | সাল | কী করেছে |
|---|---|---|
| ১ম | ১৯৫১ | নবম তপশিল; ধারা ১৫(৪); বাকস্বাধীনতায় নতুন সীমা |
| ৭ম | ১৯৫৬ | ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠন |
| ২১তম | ১৯৬৭ | অষ্টম তপশিলে সিন্ধি যুক্ত |
| ২৪তম | ১৯৭১ | মৌলিক অধিকার সংশোধনে সংসদের ক্ষমতা নিশ্চিত |
| ২৬তম | ১৯৭১ | প্রিভি পার্স বিলুপ্ত |
| ৩৬তম | ১৯৭৫ | সিকিম রাজ্য হয় |
| ৪২তম | ১৯৭৬ | “মিনি সংবিধান”; প্রস্তাবনার শব্দ; মৌলিক কর্তব্য |
| ৪৪তম | ১৯৭৮ | ৪২তমের পাল্টা পদক্ষেপ; সম্পত্তি আর মৌলিক অধিকার নয় |
| ৫২তম | ১৯৮৫ | দলত্যাগ বিরোধী আইন (দশম তপশিল) |
| ৬১তম | ১৯৮৮ | ভোটার বয়স ১৮ |
| ৭৩তম | ১৯৯২ | পঞ্চায়েতি রাজ |
| ৭৪তম | ১৯৯২ | পৌরসভা |
| ৮৬তম | ২০০২ | শিক্ষার অধিকার (ধারা ২১ক) |
| ৯১তম | ২০০৩ | মন্ত্রিপরিষদের আকারে সীমা |
| ৯৯তম | ২০১৪ | এনজেএসি, ২০১৫ সালে বাতিল |
| ১০০তম | ২০১৫ | ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত |
| ১০১তম | ২০১৬ | পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি) |
| ১০৩তম | ২০১৯ | ১০ শতাংশ ইডব্লিউএস সংরক্ষণ |
| ১০৪তম | ২০১৯ | তফসিলি জাতি-উপজাতি সংরক্ষণ ২০৩০ পর্যন্ত; অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মনোনয়ন বন্ধ |
| ১০৫তম | ২০২১ | অনগ্রসর শ্রেণি চিহ্নিত করার রাজ্যের ক্ষমতা ফেরত |
| ১০৬তম | ২০২৩ | নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ |
সংশোধনীগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই ১০৬টি পরিবর্তনের পেছনে একটি ধরন চোখে পড়ে। অনেক সংশোধনী এসেছে আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায়, হয় ভূমি সংস্কার সম্ভব করতে (১ম), নয়তো মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত রায় বদলাতে (২৪তম), নয়তো রাজ্যের হারানো ক্ষমতা ফেরাতে (১০৫তম)। কিছু এসেছে রাজনৈতিক চাপের মুহূর্তে, জরুরি অবস্থার সময়ে (৪২তম) এবং তার প্রত্যাখ্যানে (৪৪তম)। আবার কিছু নীরবে তৃণমূলে গণতন্ত্র বিস্তৃত করেছে (৭৩তম ও ৭৪তম) বা অর্থনীতির কাঠামো বদলেছে (১০১তম)। সব কিছুর মাঝে মৌলিক কাঠামো মতবাদ একটি সীমারেখার কাজ করেছে: সংশোধনের ক্ষমতা মানে সংবিধানের মূল পরিচয় নতুন করে লেখার ক্ষমতা নয়।
উপসংহার
ভারতীয় সংবিধানের সংশোধনের ইতিহাস আসলে স্বাধীন ভারতেরই ইতিহাস: ভূমি সংস্কার ও ভাষাভিত্তিক রাজ্য, সাংবিধানিক সংকট ও তা থেকে উত্তরণ, গ্রাম, অনগ্রসর শ্রেণি ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা। ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১০৬তম সংশোধনীই সর্বশেষ আইনে পরিণত পরিবর্তন। ১২৯তম ও ১৩০তম বিল কমিটিতে আছে, আর ১৩১তমের পরাজয় দেখিয়ে দিয়েছে সংবিধান সংশোধন আজও কতটা বিতর্কিত। পরবর্তী যেকোনো সংশোধনীকে আগেরগুলোর মতোই একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে: সংসদে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় হাত পড়লে রাজ্যগুলোর সম্মতি।
Your comment will appear immediately after submission.