২০০২ সালের ১৮ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের নাগপুরে জন্ম নেন প্রফুল্ল হিঙ্গে। তার বাবা প্রকাশ হিঙ্গে মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুৎ বোর্ডের চাকরি করতেন এবং বোন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। পরিবারের জন্য শিক্ষা ছিল সবার আগে, কিন্তু প্রফুল্ল ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ক্রিকেট পাগল।
“সারাদিন গলিতে ক্রিকেট খেলত। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই তাকে অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করি, আর তারপর থেকে মাঠই তার ঘর হয়ে গেল,” বলেছিলেন তার বাবা প্রকাশ হিঙ্গে।
বাবার বাধ্য হয়ে স্থানীয় রেশিমবাগ জিমখানায় ক্রিকেটের হাতেখড়ি। প্রথম দিকে প্রফুল্ল ব্যাটসম্যান হতে চাইলেও বাবার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শে তিনি পেস বোলিংয়ের দিকে মন দেন। শুরুতে ব্যাটসম্যান হিসেবে শুরু করলেও বাবা দেখলেন ছেলের মধ্যে বোলিংয়ের সম্ভাবনা বেশি।
আন্ডার-১৪ ট্রায়ালে হার
২০১৫ সালে বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের আন্ডার-১৪ ট্রায়ালে প্রথমবার ব্যর্থ হন প্রফুল্ল। বাবা ভেবেছিলেন ছেলে হয়তো হতাশ হয়ে খেলা ছেড়ে দেবে। কিন্তু প্রফুল্ল তো ভাঙার বদলে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো।
পরের বছরেই সে আন্ডার-১৬ দলে জায়গা করে নেয়, এবং তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বিদর্ভের হয়ে পথচলা
বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের পথ ধরেই প্রফুল্লের যাত্রা শুরু হয়। একসময় বোলিং অ্যাকশন নিয়েও সমস্যা ছিল, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমে তিনি নিজের অ্যাকশনকে সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে তোলেন।
২০২৪ সালে পুদুচেরির বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফিতে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। প্রথম মৌসুমেই ৪ ম্যাচে ১১টি উইকেট নেন এবং বিদর্ভ রঞ্জি ট্রফি জেতে। এরপর ২০২৫-২৬ মৌসুমে বিদর্ভ বিজয় হাজারে ট্রফিও জেতে, যেখানে প্রফুল্ল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে ৭ ম্যাচে ১৫টি উইকেট নিয়ে তিনি নজর কাড়েন।
পিঠের চোট ও ফিরে আসার লড়াই
প্রফুল্লের ক্যারিয়ারের অন্ধকার অধ্যায়টি আসে পিঠের চোট নিয়ে। স্ট্রেস ফ্র্যাকচার তার ক্যারিয়ারকে প্রায় শেষের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
“যখন প্রফুল্লের পিঠে চোট হলো, আমরা ভেবেছিলাম তার ক্রিকেট শেষ,” বলেছেন তার বাবা।
কিন্তু এই সময়েই ভরুণ আরন দেবদূতের মতো এসেছিলেন। চেন্নাইয়ের এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে প্রফুল্লকে পাঠানোর সুপারিশ করেন প্রাক্তন ভারতীয় পেসার প্রশান্ত বৈদ্য।
সেখানে কোচ এম সেন্থিলনাথন ও ভরুণ আরনের তত্ত্বাবধানে ৬ মাস প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন প্রফুল্ল।
“তার বোলিংয়ের টেকনিক্যাল বেস নিয়ে কাজ করেছি। চাপ যাতে তার পিঠে না পড়ে সেদিকে নজর দিয়েছি,” বলেছেন সেন্থিলনাথন।
গ্লেন ম্যাকগ্রার হাত ধরে আন্তর্জাতিক এক্সপোজার
এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর অস্ট্রেলীয় কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রা প্রফুল্লের লাইন-লেংথ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি প্রফুল্লকে ব্রিসবেনে নিয়ে যান, যেখানে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হাই পারফরম্যান্স সেন্টারে প্রশিক্ষণ নেন প্রফুল্ল।
এই ২০-২৫ দিনের ক্যাম্প প্রফুল্লের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে তিনি জোশ হজলউড ও জাই রিচার্ডসনের সাথে অনুশীলন করেন।
“ম্যাকগ্রা তাকে ব্রিসবেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে দিয়েছিল,” বলেছেন বাবা।
আইপিএল স্বপ্নযাত্রা: ব্যর্থতা থেকে সাফল্য
২০২৪ সালের মেগা নিলামে প্রফুল্ল আনসোল্ড গিয়েছিলেন। তখন বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরের বার নিশ্চয়ই সুযোগ পাবেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মিনি নিলামের দিন প্রফুল্ল নাগপুরের একটি মন্দিরে বসেছিলেন। মোবাইলে নিলাম দেখছিলেন। যখন সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ তার নাম বলল, তিনি মেঝেতে শুয়ে পড়েন—ভগবানকে ধন্যবাদ জানাতে।
তিনি বেস প্রাইস ৩০ লাখ রুপিতেই বিক্রি হন।
ঐতিহাসিক অভিষেক: আইপিএলের ইতিহাস গড়া
২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল। প্রতিপক্ষ রাজস্থান রয়্যালস। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে আইপিএল অভিষেক।
বাবা প্রকাশ হিঙ্গে জানতেন না যে ছেলে খেলবে। রাতে টিভি খোলার পর দেখেন প্রফুল্লের নাম স্ক্রিনে।
তারপর যা হলো—তাতে ক্রিকেট বিশ্ব স্তম্ভিত।
২১৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে রাজস্থানের ইনিংসের প্রথম ওভারেই মাত্র ১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়ে ফেলেন প্রফুল্ল। যেখানে তিনি: বৈভব সূর্যবংশীকে ১ বলে ০ রানে গোল্ডেন ডাক এবং ধ্রুব জুরেল ও লুয়ান-দ্রি প্রিটোরিয়াসকে ২ বলে ০ রানে সিলভার ডাক করেন প্রফুল হিঙ্গে।
আইপিএলের ইতিহাসে ইনিংসের প্রথম ওভারে তিনটি উইকেট নেওয়া প্রথম বোলার তিনি।
শেষ পর্যন্ত তার বোলিং ফিগার ছিল ৪ ওভারে ৩৪ রানে ৪ উইকেট। ম্যাচসেরা হয়েছিলেন।
ম্যাচ শেষে প্রফুল্ল জানান, স্বপ্ন দেখেছিলেন অভিষেকেই ৪-৫ উইকেট নেবেন।
বোলিং পরিসংখ্যান
| ফরম্যাট | ইনিংস | বল | মেডেন ওভার | রান | উইকেট | সেরা বোলিং | ইকোনমি | গড় | ৪ উইকেট | ৫ উইকেট |
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| আইপিএল (IPL) | ১ | ২৪ | ০ | ৩৪ | ৪ | ৪/৩৪ | ৮.৫০ | ৮.৫০ | ১ | ০ |
| প্রথম শ্রেণী (FC) | ১৮ | ১৫২৪ | ৫০ | ৭২০ | ২৭ | ৪/৬০ | ২.৮৪ | ২৬.৬৭ | ১ | ০ |
| লিস্ট এ (List A) | ৬ | ৩০০ | ১ | ৩০৩ | ৫ | ২/৫৪ | ৬.০৬ | ৬০.৬০ | ০ | ০ |
| টি-২০ (ঘরোয়া) | ২ | ৪২ | ০ | ৫০ | ৫ | ৪/৩৪ | ৭.১৩ | ১১.৪০ | ১ | ০ |
অভিষেক (Debut)
| ফরম্যাট | অভিষেকের তারিখ | প্রতিপক্ষ দল | বোলিং পারফরম্যান্স |
|---|---|---|---|
| আইপিএল (IPL) | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | রাজস্থান রয়্যালস | ৪ওভার/৩৪রান/৪উইকেট |
| প্রথম শ্রেণী (FC) | ১৮ অক্টোবর ২০২৪ | পুদুচেরি | ২০ওভার/৫১রান/৩উইকেট |
| লিস্ট এ (List A) | ৫ জানুয়ারি ২০২৫ | মিজোরাম | ৬ওভার/২০রান/০উইকেট |
| টি-২০ (ঘরোয়া) | ৮ ডি ২০২৫ | অন্ধ্র | ৪ওভার/২৩রান/১উইকেট |
ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পদ
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রফুল্ল হিঙ্গের মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা। তার একটি মাহিন্দ্রা থার গাড়ি রয়েছে যার মূল্য প্রায় ২০.৪৬ লাখ রুপি।
তিনি বর্তমানে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের ড্রেসিং রুমে প্যাট কামিন্স ও ভরুণ আরনের মতো তারকাদের সাথে সময় কাটাচ্ছেন।
উমেশ যাদবের প্রতি শ্রদ্ধা
প্রফুল্লের আদর্শ উমেশ যাদব। বিদর্ভ দলের ড্রেসিং রুম শেয়ার করার সময় উমেশের কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন।
“উমেশ যাদবের যাত্রা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি যখন তার গল্প বলতেন, লাগত যে ওঁর মতোই হতে হবে। তিনি কিছু না থেকেও এত বড় জায়গায় পৌঁছেছেন—এটাই বড় অনুপ্রেরণা,” বলেছেন প্রফুল্ল।
ভরুণ আরন ও গ্লেন ম্যাকগ্রার অবদান
প্রফুল্লের ক্যারিয়ারে দুই ব্যক্তির অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
- ভরুণ আরন: চোটের সময় পাশে দাঁড়ান, এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে প্রশিক্ষণ দেন
- গ্লেন ম্যাকগ্রা: ব্রিসবেনে নিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন
বাবা প্রকাশ হিঙ্গের উক্তি
ছেলের সাফল্যে বাবা প্রকাশ হিঙ্গে বলেন:
“মারাঠিতে একটা প্রবাদ আছে—’নিন্দকাচে ঘর আসাবে শেজারি’ (সমালোচকের বাড়ি পাশেই থাকা উচিত)। যতক্ষণ না কেউ বড় কিছু না করে বা নাম না করে, ততক্ষণ লোকেরা চুপ করে থাকে না। যে কেউ প্রফুল্লের যাত্রাপথে সমালোচনা করেছিল, সে আজ তার পারফরম্যান্স দিয়ে তাদের জবাব দিয়েছে।”
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
বাবা প্রকাশ হিঙ্গে মনে করেন, এখনও অনেক পথ বাকি। ভারতীয় দলে খেলার স্বপ্ন এখনও বাকি।
ভরুণ আরন, যিনি এখন এসআরএইচ-এর বোলিং কোচ, মনে করেন প্রফুল্লের এখন পুরো টুর্নামেন্ট খেলে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ।
ব্যক্তিগত পরিচিতি
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| পূর্ণ নাম | প্রফুল্ল প্রকাশ হিঙ্গে (Praful Prakash Hinge) |
| পছন্দের খেলোয়াড় | প্যাট কামিন্স (Pat Cummins) |
| জন্ম তারিখ | ১৮ জানুয়ারি ২০০২ (২৪ বছর বয়স) |
| জন্মস্থান | ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগপুর |
| বর্তমান বাসস্থান (ঘর) | ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগপুর |
| দেশের নাম | ভারত |
| উচ্চতা | ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি (১৭৮ সেমি) |
| ধর্ম | হিন্দু |
| পিতার নাম | প্রকাশ হিঙ্গে (Prakash Hinge) |
| মাতার নাম | বন্দনা হিঙ্গে (Vandana Hinge) |
| স্ত্রীর নাম | অবিবাহিত |
| ভূমিকা | ডানহাতি মিডিয়াম-ফাস্ট বোলার |
| মোট মূল্য | আনুমানিক ₹৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা |
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রফুল্ল হিঙ্গের ২০২৬ আইপিএলে মিনি নিলামে তিনি কত টাকায় বিক্রি হয়েছেন এবং কোন দলের হয়ে খেলছে?
প্রফুল্ল হিঙ্গের ২০২৬ আইপিএলে মিনি নিলামে তিনি ৩০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছেন এবং সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ (SRH) দলের হয়ে খেলছে।
প্রফুল্ল হিঙ্গের আইপিএল অভিষেক কবে হয়েছিল এবং কোন দলের বিরুদ্ধে হয়েছিল এবং কেমন পারফরমেন্স ছিল?
প্রফুল্ল হিঙ্গের আইপিএল অভিষেক ১৩ এপ্রিল ২০২৬ হয়েছিল এবং রাজস্থান রয়্যালস (RR) দলের বিরুদ্ধে হয়েছিল এবং ৪ওভার/৩৪রান/৪উইকেট। আইপিএলের ঐতিহাসিক একটি রেকর্ড ভাঙেন যেখানে তিনি আইপিএলের ইনিংসের প্রথম ওভার এই ৩টি উইকেট নেন এবং যেখানে তিনি বৈভব সূর্যবংশীকে ১ বলে ০ রানে গোল্ডেন ডাক এবং ধ্রুব জুরেল ও লুয়ান-দ্রি প্রিটোরিয়াসকে ২ বলে ০ রানে সিলভার ডাক করেন প্রফুল হিঙ্গে।
প্রফুল্ল হিঙ্গের পিতার মাতার নাম কি?
প্রফুল্ল হিঙ্গের পিতার নাম প্রকাশ হিঙ্গে (Prakash Hinge) মাতার নাম বন্দনা হিঙ্গে (Vandana Hinge)।
প্রফুল্ল হিঙ্গের জন্ম তারিখ এবং বয়স?
প্রফুল্ল হিঙ্গের জন্ম তারিখ ১৮ জানুয়ারি ২০০২ এবং বয়স ২৪ বছর।
এই তো প্রফুল্ল হিঙ্গের সম্পূর্ণ গল্প—একজন ক্রিকেটপাগল বালক, যার পথে এসেছিল ব্যর্থতা, চোট, হতাশা, কিন্তু সে কখনও থামেনি। আর তাই ২০২৬ সালের এক এপ্রিল রাতে, হায়দ্রাবাদের মাঠে, সে লিখেছিল আইপিএলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অভিষেকের গল্প।
Your comment will appear immediately after submission.