আল্লাহ তাআলাকে সঠিকভাবে জানা ও তাঁর প্রতি যথাযথ ঈমান আনার জন্য তাঁর গুণাবলি (সিফাত) সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর গুণাবলি তাঁর মহিমা, পরিপূর্ণতা ও অনন্যত্ব প্রকাশ করে। তাই প্রতিটি মুসলিমের জন্য কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত আল্লাহর সিফাতগুলো জানা ও সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখা আবশ্যক।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আল্লাহর গুণাবলি (সিফাত) অসীম ও অগণিত। কুরআন ও সহিহ হাদিসে যেসব গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোই আমরা বিশ্বাস করি। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী আল্লাহর সিফাত প্রধানত দুই প্রকার: সিফাতে যাতিয়্যাহ (সত্তাগত গুণাবলি) এবং সিফাতে ফে’লিয়্যাহ (কর্মগত গুণাবলি)। আল্লাহর গুণাবলিকে সংখ্যা দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
সিফাতের অর্থ কী?
‘সিফাত’ (صفة) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গুণ, বৈশিষ্ট্য বা পরিচয়।
ইসলামী পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলার যেসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে আল্লাহর সিফাত বলা হয়। এসব গুণাবলি আল্লাহর পরিপূর্ণতা, মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো—আল্লাহ নিজের জন্য যে গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, সেগুলোকে বিকৃতি, অস্বীকার, উপমা ও ধরণ নির্ধারণ ছাড়াই বিশ্বাস করতে হবে।
আল্লাহর গুণাবলির প্রকারভেদ
আলেমগণ সাধারণত আল্লাহর সিফাতকে দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন।
১. সিফাতে যাতিয়্যাহ (সত্তাগত গুণাবলি)
এগুলো এমন গুণাবলি যা আল্লাহর সত্তার সাথে চিরস্থায়ীভাবে সম্পর্কযুক্ত। এগুলো কখনো তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- হায়াত (চিরঞ্জীব জীবন)
- ইলম (সর্বজ্ঞতা)
- কুদরত (সর্বশক্তিমত্তা)
- ইরাদা (ইচ্ছাশক্তি)
- সামি’ (সর্বশ্রোতা)
- বাসির (সর্বদ্রষ্টা)
- কালাম (কথা বলা)
- হিকমাহ (প্রজ্ঞা)
- আজমাহ (মহানত্ব)
- ওয়াহদানিয়্যাহ (একত্ব)
এসব গুণ আল্লাহর সত্তার সাথে চিরকাল বিদ্যমান।
২. সিফাতে ফে’লিয়্যাহ (কর্মগত গুণাবলি)
এগুলো আল্লাহর ইচ্ছা ও কর্মের সাথে সম্পর্কিত গুণাবলি। আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তখন এসব কর্ম সম্পাদন করেন।
উদাহরণ—
- ইস্তিওয়া (আরশের উপর সমুন্নত হওয়া)
- নুজুল (আল্লাহর অবতরণ, যেমন হাদিসে বর্ণিত)
- রিদা (সন্তুষ্ট হওয়া)
- গাদাব (ক্রোধ করা)
- রহমত করা
- সৃষ্টি করা
- রিজিক প্রদান করা
- ক্ষমা করা
এসব গুণ আল্লাহর কর্মের সাথে সম্পর্কিত এবং তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতার প্রকাশ।
আল্লাহর গুণাবলি কি ৯৯টি?
অনেকেই মনে করেন আল্লাহর গুণাবলি মাত্র ৯৯টি। এটি সঠিক নয়।
সহিহ হাদিসে আল্লাহর ৯৯টি নামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি মাত্র ৯৯টিতেই সীমাবদ্ধ।
বরং আল্লাহর অনেক নাম ও গুণাবলি রয়েছে, যার সবগুলো মানুষের জানা নেই। কুরআন ও সুন্নাহে যতটুকু বর্ণিত হয়েছে, ততটুকুই আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি।
সিফাত সম্পর্কে সঠিক আকীদা
আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহর মূলনীতি হলো—
- আল্লাহর গুণাবলি সত্য বলে বিশ্বাস করতে হবে।
- সেগুলোর অর্থ বিকৃত করা যাবে না।
- আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা যাবে না।
- গুণাবলির প্রকৃতি বা ধরন নির্ধারণ করা যাবে না।
- কোনো সিফাত অস্বীকার করা যাবে না।
আল্লাহ যেমনভাবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন, তেমনভাবেই তাঁকে বিশ্বাস করতে হবে।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তাঁর সদৃশ কোনো কিছুই নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
(সূরা আশ-শূরা, ৪২:১১)
এই আয়াত আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে। তিনি শ্রবণ ও দর্শনের গুণে গুণান্বিত, কিন্তু তাঁর গুণাবলি কোনো সৃষ্টির মতো নয়।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।”
(সূরা আল-ইখলাস, ১১২:১-৪)
এই সূরায় আল্লাহর একত্ব ও অনন্যতার বর্ণনা রয়েছে।
হাদিসের দলিল
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন—
“নিশ্চয় আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, একশ থেকে একটি কম। যে ব্যক্তি সেগুলো সংরক্ষণ করবে (শিখবে, বুঝবে ও আমল করবে), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস আল্লাহর নামসমূহ জানার গুরুত্ব তুলে ধরে এবং তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহ দেয়।
আলেমদের মতামত
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
তিনি বলেন, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহর যেসব সিফাত এসেছে, সেগুলোকে যেমন এসেছে তেমনভাবেই গ্রহণ করতে হবে।
ইমাম মালিক (রহ.)
আরশের উপর আল্লাহর ইস্তিওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:
“ইস্তিওয়া জানা বিষয়, এর ধরন অজানা, এর প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক এবং এ সম্পর্কে অযথা প্রশ্ন করা বিদআত।”
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)
তিনি বলেন, আল্লাহর গুণাবলি অস্বীকার করা যেমন ভুল, তেমনি সেগুলোকে সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তুলনা করাও ভুল।
সাধারণ ভুল ধারণা
ভুল ধারণা: আল্লাহর গুণাবলি মাত্র ৯৯টি
সঠিক উত্তর: ৯৯টি নাম বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু আল্লাহর নাম ও গুণাবলি এর চেয়ে অনেক বেশি।
ভুল ধারণা: আল্লাহর গুণাবলি মানুষের গুণাবলির মতো
সঠিক উত্তর: কিছু শব্দ একই হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর গুণাবলি তাঁর মর্যাদার উপযোগী এবং সৃষ্টির গুণাবলির মতো নয়।
ভুল ধারণা: সিফাত নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন নেই
সঠিক উত্তর: আল্লাহকে সঠিকভাবে জানার জন্য তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
সিফাতে যাতিয়্যাহ কী?
সিফাতে যাতিয়্যাহ হলো আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পর্কিত স্থায়ী গুণাবলি, যেমন জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণ ও দর্শন।
সিফাতে ফে’লিয়্যাহ কী?
সিফাতে ফে’লিয়্যাহ হলো আল্লাহর কর্মের সাথে সম্পর্কিত গুণাবলি, যেমন সৃষ্টি করা, রিজিক প্রদান করা, ক্ষমা করা, সন্তুষ্ট হওয়া ও ক্রোধ করা।
সিফাত সম্পর্কে সঠিক আকীদা কী?
আল্লাহ নিজের জন্য যে গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন এবং রাসুল (ﷺ) যে গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, সেগুলোকে বিকৃতি, অস্বীকার, উপমা ও ধরণ নির্ধারণ ছাড়াই বিশ্বাস করাই সঠিক আকীদা।
আল্লাহর ৯৯টি নাম কি সব নামকে অন্তর্ভুক্ত করে?
না। হাদিসে বর্ণিত ৯৯টি নাম বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু আল্লাহর সব নাম ও গুণাবলি এতে সীমাবদ্ধ নয়।
আল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ কোনটি?
আল্লাহর সব গুণই পরিপূর্ণ ও মহান। তবে তাওহিদ, রহমত, জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে কুরআনে অধিক আলোচনা করা হয়েছে।
উপসংহার
আল্লাহ তাআলার গুণাবলি অসীম ও অগণিত। কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত সিফাতসমূহের প্রতি যথাযথ ঈমান রাখা মুসলিম আকীদার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন মানুষের ঈমানকে শক্তিশালী করে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে এবং তাঁর আনুগত্যের পথে পরিচালিত করে।
Your comment will appear immediately after submission.