জিব্রাইল (আ.) কে?

প্রকাশিত: লিখেছেন Farhat Khan
✅ Expert-Approved Content

জিব্রাইল (আ.) ইসলামের অন্যতম মহান ও সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতা। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবী-রাসুলদের কাছে ওহী পৌঁছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব প্রদান করেছেন। পবিত্র কুরআন নাজিল, নবীদের সাহায্য, ইসলাম শিক্ষা এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িত। তাই জিব্রাইল (আ.) সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা ইসলামী আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

জিব্রাইল (আ.) হলেন আল্লাহর সৃষ্টি করা নূরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা। তাঁর প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহর ওহী নবী-রাসুলদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কুরআনে তাঁকে ‘রূহুল আমিন’ (বিশ্বস্ত আত্মা) এবং ‘রূহুল কুদুস’ (পবিত্র আত্মা) নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি প্রায় ২৩ বছর ধরে নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর কাছে কুরআনের ওহী নিয়ে এসেছেন এবং আল্লাহর বহু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

জিব্রাইল (আ.)-এর পরিচয়

জিব্রাইল (আ.) আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি করা নূরের ফেরেশতাদের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন—

“ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”

তিনি কখনো আল্লাহর অবাধ্য হন না এবং সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। আল্লাহ তাঁকে শক্তি, বিশ্বস্ততা ও বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন।

জিব্রাইল (আ.)-এর প্রধান দায়িত্ব

জিব্রাইল (আ.)-এর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর ওহী নবী-রাসুলদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • নবী-রাসুলদের কাছে ওহী পৌঁছে দেওয়া।
  • আল্লাহর নির্দেশ ও সংবাদ পৌঁছে দেওয়া।
  • নবীদের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদান।
  • আল্লাহর নির্দেশে মুমিনদের সাহায্য করা।
  • গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনায় আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন।
  • রমজান মাসে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কুরআন পুনরালোচনা (মুরাজাআহ) করা।

কুরআনে জিব্রাইল (আ.)-এর নাম

কুরআনে জিব্রাইল (আ.)-কে বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

  • জিবরীল (جبريل) — তাঁর প্রসিদ্ধ নাম।
  • রূহুল আমিন (روح الأمين) — বিশ্বস্ত আত্মা।
  • রূহুল কুদুস (روح القدس) — পবিত্র আত্মা।

এই নামগুলো তাঁর বিশ্বস্ততা, মর্যাদা এবং ওহী বহনের দায়িত্বকে নির্দেশ করে।

নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর সঙ্গে জিব্রাইল (আ.)-এর সাক্ষাৎ

জিব্রাইল (আ.) নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর কাছে শুধু একবার নয়, বহুবার এসেছেন।

সহিহ সূত্র অনুযায়ী—

  • হেরা গুহায় প্রথম ওহী নিয়ে আসেন।
  • প্রায় ২৩ বছর ধরে কুরআনের ওহী নিয়ে আসেন।
  • রমজানে প্রতি বছর নবীর সঙ্গে কুরআন পুনরালোচনা করতেন।
  • নবীর জীবনের শেষ রমজানে দুইবার সম্পূর্ণ কুরআন পুনরালোচনা করেন।
  • হাদিসে জিব্রাইলের ঘটনায় মানুষের রূপে এসে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে শিক্ষা দেন।
  • মিরাজের রাতে নবী (ﷺ)-এর সফরে সঙ্গ দেন।
  • বদরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাদের নেতৃত্ব দিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: সহিহ হাদিসে জিব্রাইল (আ.) মোট কতবার নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেছেন—এর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ নেই। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা দাবি করা সঠিক নয়।

জিব্রাইল (আ.)-এর শক্তি ও মর্যাদা

কুরআনে তাঁকে অত্যন্ত শক্তিশালী, সম্মানিত এবং আল্লাহর আরশের নিকট মর্যাদাবান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে তাঁর আসল আকৃতিতে দুইবার দেখেছিলেন। তাঁর ৬০০টি ডানা ছিল এবং সেই ডানাগুলো দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত ছিল।

জিব্রাইল (আ.)-এর মৃত্যু হবে কি?

হ্যাঁ। জিব্রাইল (আ.) আল্লাহ নন; তিনি আল্লাহর সৃষ্টি। ইসলামী আকীদা অনুযায়ী আল্লাহ ছাড়া সব সৃষ্টিই একদিন মৃত্যুবরণ করবে।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—

“পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংসশীল। কেবল আপনার প্রতিপালকের মহান সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে।”

অতএব কিয়ামতের নির্ধারিত পর্যায়ে জিব্রাইল (আ.)-ও আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করবেন। এরপর আল্লাহ যখন পুনরুত্থান ঘটাবেন, তখন অন্যান্য সৃষ্টির মতো তাঁকেও পুনরায় জীবিত করবেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: কুরআন ও সহিহ হাদিসে জিব্রাইল (আ.) ঠিক কখন মৃত্যুবরণ করবেন বা কোন ক্রমে ফেরেশতাদের মৃত্যু হবে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট বর্ণনা নেই। তাই এ বিষয়ে অতিরিক্ত বা নির্দিষ্ট দাবি করা উচিত নয়।

মানুষের জীবন ও জিব্রাইল (আ.)-এর জীবনের পার্থক্য

  • মানুষ মাটি থেকে সৃষ্টি; জিব্রাইল (আ.) নূর থেকে সৃষ্টি।
  • মানুষ নারী-পুরুষে বিভক্ত; ফেরেশতাদের এ বৈশিষ্ট্য নেই।
  • মানুষ খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমের প্রয়োজন অনুভব করে; ফেরেশতাদের সম্পর্কে এমন বর্ণনা নেই।
  • মানুষ আল্লাহর আদেশ অমান্য করতে পারে; ফেরেশতারা কখনো অবাধ্য হন না।
  • মানুষ পরীক্ষার জন্য পৃথিবীতে এসেছে; ফেরেশতারা আল্লাহর ইবাদত ও নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য সৃষ্টি।
  • মানুষ ও ফেরেশতা—উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি এবং একদিন আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করবে।

জিব্রাইল (আ.) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • সৃষ্টি: নূর থেকে।
  • মর্যাদা: প্রধান ওহীবাহক ফেরেশতা।
  • কুরআনে উল্লেখিত উপাধি: রূহুল আমিন, রূহুল কুদুস।
  • প্রধান দায়িত্ব: ওহী পৌঁছে দেওয়া।
  • কুরআন নাজিলের সময়কাল: প্রায় ২৩ বছর।
  • আসল আকৃতি: ৬০০ ডানা (সহিহ হাদিস অনুযায়ী)।
  • মৃত্যু: আল্লাহর সকল সৃষ্টির মতো তিনিও একদিন মৃত্যুবরণ করবেন।
  • ইবাদত: সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত।

কুরআনের দলিল

সূরা আল-বাকারাহ (২:৯৭)

“বলুন, যে ব্যক্তি জিবরীলের শত্রু, সে জেনে রাখুক, আল্লাহর নির্দেশে তিনিই আপনার অন্তরে এ কুরআন নাজিল করেছেন।”

শিক্ষা

  • কুরআনের ওহী জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে নাজিল হয়েছে।
  • তিনি আল্লাহর বিশ্বস্ত দূত।

সূরা আত-তাকবীর (৮১:১৯–২১)

এখানে জিব্রাইল (আ.)-কে শক্তিশালী, সম্মানিত এবং বিশ্বস্ত ফেরেশতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষা

  • তিনি অত্যন্ত মর্যাদাবান।
  • তিনি আল্লাহর নির্দেশ কখনো অমান্য করেন না।

হাদিসের দলিল

সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিসে জিব্রাইল-এ তিনি মানুষের রূপে এসে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। পরে নবী (ﷺ) সাহাবিদের জানান, তিনি ছিলেন জিব্রাইল (আ.), যিনি তাদের দ্বীনের শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।

সহিহ হাদিসে আরও এসেছে, প্রতি রমজানে জিব্রাইল (আ.) নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কুরআন পুনরালোচনা করতেন এবং নবীর ইন্তিকালের বছর দুইবার সম্পূর্ণ কুরআন পুনরালোচনা করেন।

উপসংহার

জিব্রাইল (আ.) আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফেরেশতা এবং ওহী বহনের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি নবী-রাসুলদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর কাছে পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন। তাঁর মর্যাদা, দায়িত্ব ও জীবন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন ইসলামী আকীদা দৃঢ় করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

জিব্রাইল (আ.)-এর কাজ কী?

তাঁর প্রধান কাজ হলো আল্লাহর ওহী নবী-রাসুলদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এছাড়া আল্লাহর বিভিন্ন নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে মুমিনদের সাহায্য করাও তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

জিব্রাইল (আ.)-কে কেন ‘রূহুল আমিন’ বলা হয়?

কারণ তিনি আল্লাহর ওহী সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে কোনো পরিবর্তন বা বিকৃতি ছাড়াই নবীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

জিব্রাইল (আ.) কতবার নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেছেন?

সহিহ কুরআন বা হাদিসে এর নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ নেই। তবে প্রায় ২৩ বছর ধরে ওহী নাজিলের সময় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তিনি বহুবার নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেছেন।

জিব্রাইল (আ.)-এর কতটি ডানা ছিল?

সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে তাঁর আসল আকৃতিতে ৬০০টি ডানাসহ দেখেছিলেন।

জিব্রাইল (আ.) কি মৃত্যুবরণ করবেন?

হ্যাঁ। তিনি আল্লাহর সৃষ্টি। তাই আল্লাহর ইচ্ছায় কিয়ামতের নির্ধারিত পর্যায়ে তাঁরও মৃত্যু হবে এবং পুনরুত্থানের দিনে আল্লাহ তাঁকে পুনরায় জীবিত করবেন। তবে ঠিক কখন বা কী ক্রমে এটি ঘটবে—এ বিষয়ে সহিহ সূত্রে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।

Avatar of Farhat Khan

Farhat Khan

ফারহাত খান একজন একনিষ্ঠ ইসলামিক লেখক এবং গবেষক। তিনি মূলত উলুমুল কুরআন (তাফসীর), হাদিস শাস্ত্র এবং শুদ্ধ আকীদা নিয়ে কাজ করেন। ইসলামের মূল বাণী ও সঠিক তথ্যসূত্র পাঠকদের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

আমার সব আর্টিকেল

Your comment will appear immediately after submission.

মন্তব্য করুন