ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার বিশেষ সৃষ্টি এবং তাঁদের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের ছয়টি মৌলিক ভিত্তির একটি। কুরআন ও সহিহ হাদিসে ফেরেশতাদের সৃষ্টি, বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বর্ণিত হয়েছে। তাই একজন মুসলিমের জন্য ফেরেশতাদের প্রকৃত পরিচয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (আলো) থেকে। সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” তারা আগুন বা মাটির তৈরি নয়; বরং আল্লাহর এমন এক বিশেষ নূরানি সৃষ্টি, যারা সর্বদা তাঁর আদেশ পালন করে এবং কখনো অবাধ্য হয় না।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ফেরেশতাদের সৃষ্টি সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা
ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সৃষ্টিকে বিভিন্ন উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে, জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে এবং ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে। এই বিষয়টি সহিহ হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
ফেরেশতারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তারা নিজের ইচ্ছায় কোনো কাজ করেন না; বরং আল্লাহর প্রতিটি আদেশ নিখুঁতভাবে পালন করেন।
নূর থেকে সৃষ্টি হওয়ার অর্থ কী?
হাদিসে ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। তবে এই নূরের প্রকৃতি কেমন, তা কুরআন ও সহিহ হাদিসে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাই এ বিষয়ে অতিরিক্ত অনুমান না করে যতটুকু ওহীতে এসেছে ততটুকুতেই বিশ্বাস করা মুসলিমদের আকীদার অংশ।
মানুষ, জিন ও ফেরেশতার সৃষ্টির পার্থক্য
| সৃষ্টি | কী থেকে সৃষ্টি |
|---|---|
| মানুষ | মাটি |
| জিন | ধোঁয়াবিহীন আগুনের শিখা |
| ফেরেশতা | নূর (আলো) |
এই পার্থক্য আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও অসীম ক্ষমতার প্রমাণ।
ফেরেশতাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য
কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে জানা যায় যে ফেরেশতাদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—
- নূর থেকে সৃষ্টি।
- আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেন না।
- অত্যন্ত শক্তিশালী ও দ্রুতগতিসম্পন্ন।
- আল্লাহ চাইলে বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারেন।
- তাঁদের দুই, তিন, চার বা তারও বেশি ডানা থাকতে পারে।
- জিব্রাইল (আ.)-কে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর আসল রূপে ৬০০ ডানাসহ দেখেছিলেন।
- তাঁরা ক্লান্ত হন না এবং অবিরাম আল্লাহর ইবাদত করেন।
ফেরেশতারা কি পুরুষ না স্ত্রী?
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী ফেরেশতারা পুরুষ বা নারী নন। তাঁদের সম্পর্কে লিঙ্গ নির্ধারণ করা সঠিক নয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সেই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যারা ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলত।
ফেরেশতাদের কি খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন হয়?
কুরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ফেরেশতারা মানুষের মতো খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করেন। তাঁরা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি এবং মানুষের শারীরিক প্রয়োজনের মতো তাঁদের প্রয়োজন নেই।
ফেরেশতাদের সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য
আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। যেমন—
- আল্লাহর ইবাদত করা।
- নবী-রাসুলদের কাছে ওহী পৌঁছে দেওয়া।
- মানুষের আমল লিপিবদ্ধ করা।
- রিজিক, বৃষ্টি ও প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় পরিচালনায় আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা।
- মুমিনদের সাহায্য করা।
- মৃত্যুর সময় আত্মা কবজ করা।
- জান্নাত ও জাহান্নামের দায়িত্ব পালন করা।
ফেরেশতাদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- সৃষ্টি: নূর (আলো) থেকে।
- তারা কখনো গুনাহ করে না।
- তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না।
- মানুষের চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।
- আল্লাহ চাইলে মানুষের রূপ ধারণ করতে পারেন।
- কিয়ামতের আগে অন্যান্য সৃষ্টির মতো তাঁরাও আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করবেন, এরপর পুনরায় জীবিত করা হবে।
কুরআনের দলিল
সূরা ফাতির (৩৫:১)
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা এবং ফেরেশতাদেরকে বার্তাবাহক করেছেন—যাদের দুই, তিন ও চারটি ডানা রয়েছে।”
শিক্ষা
- ফেরেশতারা আল্লাহর সৃষ্টি।
- তাঁদের ডানা রয়েছে।
- তাঁরা আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নকারী।
সূরা আত-তাহরীম (৬৬:৬)
“তারা আল্লাহ তাদের যা আদেশ করেন তা অমান্য করে না; বরং যা আদেশ করা হয় তাই পালন করে।”
শিক্ষা
- ফেরেশতারা কখনো অবাধ্য হয় না।
- তারা সর্বদা আল্লাহর আদেশ পালন করে।
হাদিসের দলিল
সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন—
“ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, জিনদের ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে তোমাদের কাছে বর্ণিত বস্তু (মাটি) থেকে।”
এই হাদিসই ফেরেশতাদের সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে সবচেয়ে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য দলিল।
আলেমদের মতামত
ইমাম আন-নাওয়াবী (রহ.)
তিনি বলেন, সহিহ মুসলিমের এই হাদিস ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.)
তিনি উল্লেখ করেন, ফেরেশতারা সম্মানিত সৃষ্টি; তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না এবং নির্ধারিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.)
তিনি বলেন, ফেরেশতাদের সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহে যা এসেছে, মুসলিমদের উচিত তা-ই বিশ্বাস করা এবং অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে ভিত্তিহীন কল্পনা থেকে বিরত থাকা।
সাধারণ ভুল ধারণা
ভুল ধারণা: ফেরেশতারা আগুন থেকে সৃষ্টি।
সঠিক উত্তর: না। সহিহ মুসলিম অনুযায়ী ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে, আর জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে।
ভুল ধারণা: ফেরেশতারা নারী।
সঠিক উত্তর: এটি কুরআন দ্বারা প্রত্যাখ্যাত একটি ভ্রান্ত ধারণা। ফেরেশতাদের নারী বা পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি।
ভুল ধারণা: ফেরেশতারা মানুষের মতো খাওয়া-দাওয়া করেন।
সঠিক উত্তর: কুরআন ও সহিহ হাদিসে এর কোনো প্রমাণ নেই। তাঁরা মানুষের মতো জীবনযাপন করেন না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
ফেরেশতারা কী দিয়ে তৈরি?
ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (আলো) থেকে। এটি সহিহ মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
ফেরেশতাদের কি ডানা আছে?
হ্যাঁ। কুরআনে উল্লেখ রয়েছে যে ফেরেশতাদের দুই, তিন, চার বা তারও বেশি ডানা রয়েছে। জিব্রাইল (আ.)-এর ৬০০ ডানা ছিল বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
ফেরেশতারা কি খায়?
কুরআন ও সহিহ হাদিসে ফেরেশতাদের খাদ্য গ্রহণের কোনো প্রমাণ নেই। তাঁরা মানুষের মতো খাদ্যনির্ভর নন।
ফেরেশতারা কি মৃত্যুবরণ করবেন?
হ্যাঁ। অন্যান্য সৃষ্টির মতো ফেরেশতারাও আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করবেন এবং কিয়ামতের পর পুনরায় জীবিত করা হবে।
ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনা ইসলামের ছয়টি ঈমানের মূল ভিত্তির একটি। তাঁদের প্রতি বিশ্বাস ছাড়া পূর্ণ ঈমান সম্পন্ন হয় না।
উপসংহার
ফেরেশতারা আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্ট সম্মানিত সৃষ্টি, যারা সর্বদা তাঁর আদেশ পালন করেন এবং কখনো অবাধ্য হন না। তাঁদের সৃষ্টি, বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ হাদিসে যা এসেছে, তা-ই বিশ্বাস করা একজন মুসলিমের সঠিক আকীদার অংশ। এই জ্ঞান আমাদের ঈমানকে আরও দৃঢ় করে এবং আল্লাহর মহিমা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
Your comment will appear immediately after submission.